পোশাকশিল্পে শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা, উসকানি ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর দাবি, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক কিছু পক্ষ শ্রমিকদের ব্যবহার করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিতে দেরি হওয়ায় অসন্তোষ বেড়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) সচিবালয়ে পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দিনে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টার সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠনের নেতারা জড়িত নন বলে সরকার মনে করে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে কাজে লাগিয়ে সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। সহিংসতা, সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হবে। এসব ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।
২০ থেকে ২২ শ্রমিক নেতার সম্পৃক্ততার সন্দেহ
পোশাকশিল্পের অস্থিরতায় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট শ্রমিক নেতাদের ভূমিকা নিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের কথা জানিয়েছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, আন্দোলন সহিংস রূপ নেওয়ার পর পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ৩৩ নেতাকর্মীকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া আন্দোলনে ভূমিকা রাখার সন্দেহে ২০ থেকে ২২ জন শ্রমিক নেতার একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি
শ্রমিকদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বর্তমান বেতনে সংসার চালাতে অসুবিধার কথা তুলে ধরে তাঁরা এ দাবি জানিয়ে আসছেন।
আন্দোলন শুরুর পর মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বেলা ১১টা পর্যন্ত দেশের ৩০৬টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন মালিকেরা। এসব কারখানায় প্রায় সাত লাখ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর ও ময়মনসিংহে সবচেয়ে বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এ দুই এলাকায় ১৬১টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানায় প্রায় ৪ লাখ ২৯ হাজার শ্রমিক কর্মরত।
এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ৯৩টি এবং রাজধানীর মিরপুরে ৫২টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
বিজিএমইএর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির সদস্যভুক্ত ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে মঙ্গলবার ১ হাজার ৮২৮টি চালু ছিল। অর্থাৎ সদস্যভুক্ত প্রায় ১৪ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এসব কারখানা বন্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিক নেতা ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা।
মজুরি বোর্ড গঠনের পরও কেন অসন্তোষ
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ১ নভেম্বর বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পরপর নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া নেওয়ার কথা রয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে আগের তিন বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
শ্রমিক নেতাদের দাবি, নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া হলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না। শ্রমিক নেতা তৌহিদুর রহমান জানান, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে দেরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, শ্রম মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, বোর্ড গঠনের জন্য মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নাম সংগ্রহসহ নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি মনোনয়নে সময় লাগায় বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আন্দোলনে বাইরের ইন্ধনের অভিযোগ
তৈরি পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা শ্রমিকদের ছদ্মবেশে কিংবা আন্দোলনকারীদের আড়ালে থেকে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে বলে পুলিশের মনে হয়েছে।
সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন এবং সরকারের পক্ষ থেকে ন্যায্যতার আশ্বাস দেওয়ার পরও সড়কে সহিংসতা চালিয়ে যাওয়ার পেছনে পতিত সরকারের সমর্থকদের হাত রয়েছে বলে মনে করছে সরকার।
সহিংসতার ঘটনায় প্রতিবেশী দেশের ইন্ধন রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, শ্রমিকদের দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠন করা। সেটি হয়েছে। এখন যারা আন্দোলন করছে, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে।
এদিকে, আন্দোলনের ঘটনায় সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন দেওয়ার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে আন্দোলনের মূল দাবির বিষয়ে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে আন্দোলন প্রশমিত হওয়ার কথা। কিন্তু এরপরও যেভাবে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকৃত পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য দাবি রয়েছে এবং শুরুতে তাঁরাও আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তবে আন্দোলনের মধ্যে কিছু ব্যক্তির সহিংস আচরণ প্রকৃত শ্রমিকদের আচরণ হতে পারে না বলে সরকার মনে করছে।
কারখানা বন্ধের আশঙ্কায় বিপাকে শ্রমিকেরা
চলমান অস্থিরতার মধ্যে উৎপাদন ও ব্যবসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কারখানার মালিকেরা। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকেরা কাজে না ফিরলে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা সাময়িক বন্ধ করতে হতে পারে।
এই ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কারখানা বন্ধ রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে কারখানা বন্ধ হলে ওই সময়ের জন্য শ্রমিকেরা মজুরি পাবেন না। ফলে আন্দোলনের কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকদের আয় ও জীবিকা আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, সরকার কোনো শিল্পকারখানা বন্ধ হোক, তা চায় না। শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চায় সরকার। একই সঙ্গে আন্দোলনের নামে সহিংসতা বা নাশকতার চেষ্টা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
পোশাকশিল্পে চলমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত দাবির পাশাপাশি সহিংসতা ও রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগও সামনে এসেছে। আন্দোলনে কারা সহিংসতা উসকে দিচ্ছে, তা নির্ধারণে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির সমাধান এবং কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:







