সোমবার

২ নভেম্বর, ২০২৬ ১৮ কার্তিক, ১৪৩৩

মামলা-জেলেও মূল্যায়ন নেই, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিএনপির নেতার ক্ষোভ

মোছাব্বির হাসান সজীব,ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২ নভেম্বর, ২০২৬ ০৯:০৮

আপডেট: ২ নভেম্বর, ২০২৬ ১০:০৪

শেয়ার

মামলা-জেলেও মূল্যায়ন নেই, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিএনপির নেতার ক্ষোভ
ছবি: সংগৃহীত

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির রাজনীতিতে ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিএনপিতে পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন মোঃ মাহফুজুর রহমান পুষ্প। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর বিএনপির প্রচার সম্পাদক।

রবিবার নিজের ফেসবুক পেজে দেয়া এক আবেগঘন পোস্টে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ত্যাগীদের চোখের জল কি বিএনপির কাছে মূল্যহীন হয়ে গেল?’

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, নির্যাতন, মামলা ও কারাভোগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পুষ্প লিখেছেন, বিএনপির দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, জেল খেটেছেন এবং পরিবার-পরিজনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, তাদের অনেকেই এখন যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। অথচ আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে বিএনপির কিছু নেতা দলে জায়গা করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নিজের রাজনৈতিক জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এই বিএনপি নেতা জানান, তাঁর বিরুদ্ধে ৩৪টি রাজনৈতিক মামলা রয়েছে। তিন দফায় তাঁকে ১৮ মাস কারাভোগ করতে হয়েছে। গ্রেপ্তার, বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে থাকা, ব্যবসা-বাণিজ্য হারানোসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাঁকে রাজনৈতিক জীবন অতিবাহিত করতে হয়েছে।

পোস্টে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ২০১৫ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পরও তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। পরে বাবার মরদেহ কারাগারে নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়। রাত ১০টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে বাবার জানাজার নামাজ পড়লেও শেষবারের মতো বাবার কবরে মাটি দিতে পারেননি তিনি।

এই স্মৃতিচারণ করে পুষ্প প্রশ্ন তুলেছেন, দলের জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করা নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন যদি না হয়, তাহলে তাঁদের আত্মত্যাগের মূল্য কোথায়?

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে আসা কিছু ব্যক্তি এখন দলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন। তাঁদের কারও কারও অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি কেউ কেউ বিএনপির বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছেন এবং জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন বলে তাঁর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পোস্টে দলের কিছু নেতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিস্বার্থ ও অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত কিছু অর্থলোভী নেতার কর্মকাণ্ডে ত্যাগী কর্মীরা হতাশ ও বিব্রত। ঘুষ, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিযোগিতা দেখে তিনি লজ্জিত বলেও উল্লেখ করেন।

পুষ্প বলেন, মামলা খাওয়ার সময় আমরা দলের, আর ক্ষমতা ও সুবিধা ভাগাভাগির সময় অন্যরা রাজনীতি কি তাহলে ত্যাগের নয়, সুবিধা নেয়ার নাম?

তিনি দলের সিনিয়র নেতাদের প্রতি অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে দলের দুঃসময়ে যারা নির্যাতন সহ্য করেছেন, মামলা মাথায় নিয়ে রাজপথে ছিলেন এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান ও সাংগঠনিক স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। তিনি বিএনপিকে ভালোবাসেন এবং দলের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন ও সুবিধাবাদীদের পুনর্বাসন অব্যাহত থাকলে একসময় অভিমান নিয়ে দল থেকে সরে দাঁড়ানো ছাড়া তাঁদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।

পোস্টের শেষাংশে তিনি লিখেছেন, এই বক্তব্য শুধু তাঁকে নিয়ে নয়; তাঁর মতো দলের লাখো ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীর মনের কথা। অনেক কর্মীর গাড়িভাড়া না থাকলেও তাঁরা মিছিলে যোগ দিয়েছেন, দলের জন্য নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন।

তাঁর ভাষায়, আমরা দল ছেড়ে যেতে চাই না, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়েও রাজনীতি করতে চাই না।

বিএনপির দুঃসময়ে ত্যাগ স্বীকার করা নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের দলে অন্তর্ভুক্তির অভিযোগের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত যে বার্তাটি দিয়েছেন, তা হল ত্যাগীদের চোখের জল যেন একদিন দলের জন্য অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায়।