শনিবার

৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬ কার্তিক, ১৪৩৩

ইয়াবা ও টাকা ছিনিয়ে নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দিল পুলিশ !

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:০৪

শেয়ার

ইয়াবা ও টাকা ছিনিয়ে নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দিল পুলিশ !
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানার একদল পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বাস থেকে এক যাত্রীকে নামিয়ে ইয়াবা ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। প্রথমে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক্স-রে রিপোর্টে শরীরে মাদকের অস্তিত্ব মিললেও, মাত্র ১ ঘণ্টার ব্যবধানে দ্বিতীয় এক্স-রে রিপোর্টে সেই মাদক রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখার পর ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেয়া হয়। পুরো ঘটনার সত্যতা মিলেছে সিসিটিভি ফুটেজে।

জানা যায়, গত ২৮ অক্টোবর বুধবার সন্ধ্যা সাতটায় বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে অলংকার মোড় থেকে এসপি গ্রিনলাইন বাসে ওঠেন সোহেল হাওলাদার নামে এক ব্যক্তি। সিটি গেইট এলাকায় পৌঁছানোর পর বাসটি থামায় আকবর শাহ থানা পুলিশ। তল্লাশি শেষে সোহেলকে নিচে নামিয়ে পুলিশের গাড়িতে করে নিকটবর্তী গোল্ডেন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেয়া হয়।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে এসে দাঁড়ায় পুলিশের গাড়ি। সাদা পোশাকের এক সোর্স ও পুলিশের পোশাক পরিহিত এক কনস্টেবল সোহেলকে নিয়ে দোতলার এক্স-রে কক্ষে যান। তারপর এক্স-রে রিপোর্টে ইয়াবা পাওয়ার বিষয়টি গাড়িতে থাকা এসআই রবিউল হোসেনকে জানায় এক কনস্টেবল। মোবাইলে এক্স-রে রিপোর্টের ছবিও দেখানো হয় তাকে।

বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর এসআই রবিউলসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা ভেতরে প্রবেশ করেন। দুই মিনিট পর সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সোহেলের মোবাইলগুলো কেড়ে নেন কনস্টেবল হালিম। এরপর সবাই মিলে গাড়িতে ওঠেন।

গোল্ডেন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মচারী আপেল মোহাম্মদ জানান, এক্স-রে চিত্রে ওই ব্যক্তির শরীরে প্যাকেট সদৃশ বস্তুর অস্তিত্ব স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল।

সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে বের হয়ে পুলিশের গাড়িটি সোহেলকে নিয়ে আউটার রিং রোডের দিকে চলে যায়।

এরপরের ঘটনা জানতে একটি সূত্রের মাধ্যমে সোহেল হাওলাদারের সাথে যোগাযোগ করা হয়।

ওই দিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সোহেল হাওলাদার জানান, পুলিশের গাড়িটি তাকে আউটার রিং রোডে অবস্থিত ডিসি পার্কের পাশে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার ভয় দেখানো হয়। এ সময় তার শরীরের সংবেদনশীল স্থানে হলুদ টেপ দিয়ে বিশেষ কায়দায় মোড়ানো ১৬শ পিস ইয়াবা কেড়ে নেওয়া হয়। এছাড়া তার পকেট থেকে নগদ ৮১ হাজার টাকাও নিয়ে নেয় পুলিশ। পরে তাকে পুনরায় পুলিশের গাড়িতে করে নগরীর একেখান মোড় সংলগ্ন আল-আমিন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আনা হয়।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ৮টা ৫ মিনিটে সোহেলকে নিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক্স-রে কক্ষে যান ওই পুলিশ সদস্যরা।

সেখানকার এক কর্মচারী জানান, ওই সময় পুলিশ এক ব্যক্তিকে এক্স-রে করালেও তখন তার শরীরে কিছু না পাওয়ায় এক্স-রে ডেটা মুছে ফেলা হয়।

সোহেলের ভাষ্যমতে, আল-আমিন ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে বের করার পর কনস্টেবল হালিম তার একটি ভিডিও স্বীকারোক্তি রেকর্ড করেন, যেখানে বলানো হয় যে তার কাছে কোনো ইয়াবা বা টাকা পাওয়া যায়নি। মোবাইলগুলো ফেরত দেয়া হলেও নগদ টাকা ও সিম কার্ড রেখে দেয়া হয়। পকেটে কোনো টাকা না থাকায় গাড়ি ভাড়া হিসেবে এসআই রবিউল তাকে পাঁচশো টাকা দেন। পরে রাত সাড়ে নয়টায় ফৌজদারহাট নার্সিং কলেজের সামনে তাকে নামিয়ে দিয়ে পুলিশ চলে যায়।

আকবর শাহ থানা সূত্রে জানা যায়, ওই দিন থানার কল সাইন- 'সিয়েরা-৪৪ (দিবা)' ডিউটিতে ছিলেন এসআই রবিউল হোসেন ও চার কনস্টেবল। 'সিএমপি-১৮৩' নম্বরের গাড়িটির চালকের দায়িত্বে ছিলেন কনস্টেবল হালিম।

অভিযোগের বিষয়ে এসআই রবিউল হোসেন দাবি করেন, প্রথম ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়ায় আল-আমিন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পুনরায় এক্স-রে করানো হয়, যেখানে কিছু পাওয়া যায়নি। গাড়িটি আউটার রিং রোডে যাওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, এটি নিয়মিত টহলের অংশ। তবে বাস থেকে যাত্রী নামিয়ে আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখার বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

আকবর শাহ থানার ওসি মোহাম্মদ নাজের হোসেন এ বিষয়ে বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও ছবিগুলো যেন তাকে হোয়াটসঅ্যাপে দেয়া হয়।

এদিকে সোহেল স্বীকার করেন যে, তিনি চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ এলাকা থেকে ৩ লাখ ৪ হাজার টাকায় ১৬শ পিস ইয়াবা কিনে বাগেরহাটে নিয়ে যাচ্ছিলেন।অল্প সময়ে বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে কিস্তির টাকা ও স্ত্রীর স্বর্ণ বন্ধক রেখে তিনি প্রথমবার এই ব্যবসায় জড়িয়েছেন বলে জানান। তার বিরুদ্ধে একটি মাদক মামলাসহ মোট ১৬টি মামলা রয়েছে।