বুধবার

২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩ কার্তিক, ১৪৩৩

হবিগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু: বাংলা এডিশনে সংবাদ প্রকাশের পর নিরপেক্ষ তদন্তের আবেদন

শেখ বেলাল, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:২০

শেয়ার

হবিগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু: বাংলা এডিশনে সংবাদ প্রকাশের পর নিরপেক্ষ তদন্তের আবেদন
ছবি: বাংলা এডিশন

হবিগঞ্জের মাধবপুরে দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ আকলিমা আক্তারের রহস্যজনক মৃত্যু, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ এবং ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনের ঘটনায় গত ২৫ অক্টোবর বাংলা এডিশনে সংবাদ প্রকাশের পর নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আবেদন করেছেন এক মানবাধিকারকর্মী।

এবিষয়ে আইন সহায়তা কেন্দ্র আসক ও মানবাধিকার ফাউন্ডেশন, হবিগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী (ইলিয়াস) আজ ২৮ অক্টোবর বুধবার হবিগঞ্জ পুলিশ সুপার বরাবরে দেয়া আবেদনে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, থানায় অভিযোগ গ্রহণ ও পরবর্তী কার্যক্রম যাচাই, কথিত সালিশ ও আপস-মীমাংসায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত এবং নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাধবপুর উপজেলার বুল্লা ইউনিয়নের পৈলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা আকলিমা আক্তারের সঙ্গে একই গ্রামের চান মিয়া চৌধুরীর প্রায় ১৬ বছর আগে বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে তিন সন্তান রয়েছে।

আকলিমার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে যৌতুকের দাবিতে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। পরবর্তী সময়ে স্বামী চান মিয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে স্ত্রীর কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি এবং ওই টাকা দিতে না পারায় তাঁকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে নির্যাতনের সঙ্গে আকলিমার মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর আকলিমা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়ার পথে মাধবপুরে একটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল, মৃত্যুর আগে কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল কি না এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিতে কী তথ্য রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারী। ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাঁর লাশ দাফন করা হয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মৃত্যুর সনদ, হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ময়নাতদন্ত না হওয়ার কারণ অনুসন্ধান এবং আইনগতভাবে সম্ভব হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে।

আবেদনে প্রকাশিত বাংলা এডিশনের বরাত দিয়ে বলা হয়, গত ২১ অক্টোবর রাত আনুমানিক ২টার দিকে হবিগঞ্জ আইনজীবী সমিতির একজন শিক্ষানবিশ আইনজীবী কামাল খান মাধবপুর থানায় উপস্থিত হয়ে আকলিমার ভাই সুমন চৌধুরীকে বাদী করে একটি লিখিত অভিযোগ তৈরি করান। ওই অভিযোগে চান মিয়া চৌধুরী, তাঁর বোনজামাই জালাল মিয়াসহ পাঁচজনের নাম ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, কামাল খান পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে চান মিয়া চৌধুরীকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন এবং তাঁকে সারা রাত থানায় রাখা হয়। পরে কোন প্রক্রিয়ায় তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন আবেদনকারী।

এ অবস্থায় অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছিল কি না, অভিযুক্তকে আটক ও পরে ছেড়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কী আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

এ জন্য থানার সাধারণ ডায়েরি, অভিযোগ গ্রহণের রেজিস্টার, মামলাসংক্রান্ত নথি, হাজত রেজিস্টার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করার অনুরোধ করা হয়েছে।

আকলিমার লাশ দাফনের পর স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির উদ্যোগে সালিশ ও আপস-মীমাংসা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ছাতিয়াইন গ্রামের নানু মিয়া, সেলিম মিয়া, কবির খান চৌধুরীসহ কয়েকজনের নাম আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে মধ্যস্থতা করা হয়েছিল এবং উভয় পক্ষের স্বাক্ষরসংবলিত একটি স্ট্যাম্পে সমঝোতার শর্ত লিখে তা গোপন রাখা হয়েছে। তবে কথিত আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ ও প্রকৃতি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আবেদনকারী বলেছেন, সালিশের প্রকৃত উদ্দেশ্য, অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা, স্ট্যাম্পে লেখা শর্ত, কোনো আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকলে তার প্রকৃতি এবং নিহতের পরিবারের সদস্যরা স্বেচ্ছায় সমঝোতায় সম্মত হয়েছিলেন কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ, কথিত সমঝোতার স্ট্যাম্প সংগ্রহ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানানো হয়েছে।

আকলিমার পরিবারের অভিযোগ, মামলা-মোকদ্দমায় না জড়ানোর জন্য তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং প্রাণনাশের হুমকিও দেয়া হচ্ছে। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছেন আবেদনকারী।

তাঁর মতে, পরিবারের সদস্যরা যেন নির্ভয়ে তদন্তে সহযোগিতা করতে পারেন এবং আইনগত প্রতিকার চাইতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

আবেদনে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ যাচাই, মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান, থানার কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং কথিত সালিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি, থানার রেকর্ড, কথিত সমঝোতার স্ট্যাম্পসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত আইনানুগভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ করা হয়েছে।

আবেদনকারী নুরুল হুদা চৌধুরী (ইলিয়াস) বলেন, কাউকে আগাম অপরাধী সাব্যস্ত করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানি বন্ধ এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

তিনি বিষয়টির মানবিক ও আইনগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।