সোমবার

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১১ কার্তিক, ১৪৩৩

খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও গুলির ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ; নিরাপত্তাহীনতায় নগরবাসী

জিসান কবিরাজ, খুলনা

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৪১

শেয়ার

খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও গুলির ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ; নিরাপত্তাহীনতায় নগরবাসী
ছবি: সংগৃহীত

খুলনা নগরীতে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, গুলির শব্দ এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, অপরাধের ধারাবাহিকতা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় নগরীর পরিবেশ থমথমে হয়ে ওঠায় জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে।

রবিবার নগরীর বসুপাড়া এলাকায় বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভাড়াটিয়ার বিরোধের জেরে এক ভাড়াটিয়াকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, বাড়িভাড়া নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে ওই ভাড়াটিয়ার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। পরে তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে রবিবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় বাড়িওয়ালাকে আটক করে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।

বসুপাড়ার এ ঘটনা নগরীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে চলমান উদ্বেগের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাড়িভাড়া নিয়ে বিরোধের মতো ব্যক্তিগত বিষয় থেকে প্রাণহানির ঘটনা ঘটায় জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নগরীতে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও গুলির শব্দের মধ্যে এমন ঘটনা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

খুলনায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক কারবার, আধিপত্য বিস্তার এবং বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মাদক এবং অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কোন্দল কাজ করছে। এসব বিরোধের জেরে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অপরাধের ধরন ও কারণ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত এবং আইনের আওতায় আনার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ৩৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩১টির রহস্য উদ্ঘাটন করে ৫৮ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে। একই সময়ে মহানগরীতে ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৩৩টি গুলি এবং তিনটি ককটেল উদ্ধারের তথ্যও পাওয়া গেছে। উদ্ঘাটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে ১১টি মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকেন্দ্রিক বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। আরও ১১টি হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া খুলনা মহানগরী ও জেলায় চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে মোট ৬৮টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। মহানগর পুলিশের আটটি থানায় ১৮১ জন সন্ত্রাসী, ৫৮৪ জন মাদক বিক্রেতা এবং ৬৯ জন চাঁদাবাজকে তালিকাভুক্ত করার তথ্যও রয়েছে। এসব পরিসংখ্যান নগরী ও আশপাশের এলাকায় অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে মহানগরী ও জেলার হিসাব পৃথক হওয়ায় পরিসংখ্যান বিবেচনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিধি ও সময়সীমা আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার নগরীর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, দিন যত যাচ্ছে, খুলনার অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছে। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এখন রাতে বাইরে বের হতে ভয় পান। রাত ১১টা বাজতেই নগরীতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করে।

তাঁর বক্তব্যে নগরীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিকদের উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একের পর এক অপরাধমূলক ঘটনা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা। নগরবাসীর প্রত্যাশা, তাঁরা যেন কোনো ধরনের ভয় বা নিরাপত্তাহীনতা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন। এ জন্য অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে খুলনাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার নেতারা ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ। তাঁদের মতে, মাদক কারবার, অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়া নয়, বরং অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে এমন এলাকাগুলোতে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ জোরদার করাও প্রয়োজন।

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং সংঘাতের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি আনা সম্ভব। একই সঙ্গে নগরীর বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনাও জরুরি।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) ও জেলা পুলিশ জানিয়েছে, বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক এবং অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কোন্দল কাজ করছে। অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে তারা আশাবাদী।

খুলনার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ দমনে যৌথ বাহিনীর অভিযান এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের উদ্যোগের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও গুলির ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে এসব অভিযান কতটা কার্যকর হচ্ছে, সে বিষয়ে জনমনে প্রত্যাশা রয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠছে।

নগরীর সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মাধ্যমে অপরাধের ঝুঁকি কমানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপরাধের প্রতিটি ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রত্যাশা করছেন সচেতন নাগরিকেরা।

খুলনায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও গুলির ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। একদিকে নাগরিক সমাজ বিশেষ অভিযান ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে পুলিশ অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। এখন নগরবাসীর প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে আসবে।

ঘটনার তদন্ত চলছে। জড়িত যেই হোক, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না‌ এমন অবস্থানের প্রতিফলন যেন অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বাস্তবে দেখা যায়, সেটিই এখন নগরবাসীর প্রত্যাশা। খুলনায় নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।