সোমবার

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১১ কার্তিক, ১৪৩৩

দাফনের জায়গা না পেয়ে বসতঘরেই কবর হলো করিম মিয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:৫৩

শেয়ার

দাফনের জায়গা না পেয়ে বসতঘরেই কবর হলো করিম মিয়ার
ছবি সংগৃহীত

শেরপুরের শ্রীবরদীতে দাফনের জন্য আলাদা জায়গা না থাকায় নিজের বসতঘরেই কবর দেওয়া হয়েছে করিম মিয়া (৭০) নামের এক বৃদ্ধকে। দীর্ঘদিন পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ অবস্থায় দিন কাটানো এই বৃদ্ধ জীবদ্দশায় ভিক্ষা করে চলতেন। মৃত্যুর পরও তাঁর দাফনের জন্য মেলেনি আলাদা জায়গা। শেষ পর্যন্ত পরিবারের বসবাসের ঘরের টিনের বেড়া খুলে সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। এতে স্ত্রী-সন্তানদের থাকার ঘরটিই এখন পরিণত হয়েছে কবরস্থানে।

করিম মিয়া শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার তাতিহাটি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শালমারা গ্রামের বাসিন্দা। রবিবার (২৫ অক্টোবর) দুপুর ২টার দিকে তিনি মারা যান। পরদিন সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে নিজেদের বসতঘরের ভেতর তাঁকে দাফন করা হয়।

চিকিৎসার জন্য জমি কিনেও শেষ রক্ষা হয়নি

করিম মিয়ার বড় মেয়ে কোতুলী বেগম জানান, তাঁর বাবা দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে ঘরে পড়ে ছিলেন। বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে তিনি তাঁর ফুফুর কাছ থেকে বাবার থাকার ঘরসহ ৩ শতাংশ জমি কিনে নেন। জমি কেনার পরও ঘরটি তাঁর বাবা-মায়ের বসতবাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে বাবাকে দাফন করার মতো পরিবারের অন্য কোনো জায়গা না থাকায় শেষ পর্যন্ত সেই ঘরেই কবর দিতে হয়েছে।

কোতুলী বেগম বলেন, তাঁরা দুই ভাই-বোন ঢাকায় বাসাবাড়িতে কাজ করেন। আরেক বোন স্বামীর বাড়িতে থাকেন। বাবাকে কবর দেওয়ার মতো কোনো জায়গাজমি তাঁদের নেই। সরকারি কবরস্থান থাকলে সেখানে দাফন করা সম্ভব হতো। কিন্তু এলাকায় সেই ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে ঘরের ভেতরেই কবর দিতে হয়েছে।

বসবাসের ঘর নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট

পরিবারের ভাষ্য, এলাকায় সরকারি কবরস্থান থাকলে করিম মিয়াকে সেখানে দাফন করা সম্ভব হতো। বিকল্প কোনো জায়গা না থাকায় বসতঘরেই তাঁকে সমাহিত করতে হয়েছে। ফলে পরিবারের সদস্যদের থাকার জায়গা নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় আমিনুল জানান, করিম মিয়ার পরিবারের নিজস্ব জমি বলতে বসতভিটার জমিটুকুই ছিল। তাঁর ছেলে কবির ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এখন তিনি বাড়িতে ফিরলে বাবার কবর থাকা সেই ঘরেই থাকতে হবে।

স্থানীয় নাদিম বলেন, এলাকায় নেতাকর্মী ও বিত্তবান মানুষের অভাব না থাকলেও করিম মিয়ার দাফনের জন্য আলাদা জায়গার ব্যবস্থা হয়নি। এমন পরিস্থিতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে যেন কাউকে দাফনের জায়গার অভাবে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়, সে জন্য উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বাবাকে হারানোর শোকের সঙ্গে বসবাসের ঘরেই তাঁর কবর হওয়ার বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে পরিবারটিকে। যে ঘরে এত দিন করিম মিয়া ও তাঁর স্ত্রী সংসার করেছেন, সেই ঘরেই এখন শায়িত তিনি। জীবদ্দশায় অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করা এই বৃদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সামনে দেখা দিয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।

পরিবারের এই ঘটনা এলাকায় সরকারি কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা এবং অসহায় মানুষের শেষ বিদায়ের ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পরিবারের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা তাঁদের পাশে দাঁড়াবেন, যাতে বসতঘরে কবর হওয়ার পরও মাথা গোঁজার আশ্রয়টুকু নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে না হয়।