সোমবার

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১১ কার্তিক, ১৪৩৩

হবিগঞ্জে গৃহবধূর মৃত্যু, ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের অভিযোগ

শেখ বেলাল,হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৪১

শেয়ার

হবিগঞ্জে গৃহবধূর মৃত্যু, ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

হবিগঞ্জের মাধবপুরে দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ আকলিমা আক্তারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ, মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন এবং অর্থের বিনিময়ে আপস-মীমাংসার অভিযোগ ঘিরে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে। পরিবারের অভিযোগ, আকলিমার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর স্বামীকে আটক করে থানায় নেয়া হলেও পরে তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা এবং স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যস্থতায় সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ ঘটনায় স্থানীয় সুদি ব্যবসায়ী নানু মিয়া, পীর, জালাল মিয়া, সেলিম মিয়া, বিএনপি নেতা কবির খান চৌধুরীসহ কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে। তবে ১৫ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কবির খান চৌধুরী। তাঁর দাবি, সালিশে চান মিয়া চৌধুরীর সম্পত্তি চার সন্তানের মধ্যে সমানভাবে বণ্টনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাধবপুর উপজেলার বুল্লা ইউনিয়নের পৈলাবাড়ি গ্রামের আকলিমা আক্তারের সঙ্গে প্রায় ১৬ বছর আগে চান মিয়া চৌধুরীর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে তিন সন্তান রয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে আকলিমাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন তাঁর স্বামী। একপর্যায়ে চান মিয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর তাঁদের দাম্পত্য কলহ আরও বেড়ে যায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে স্ত্রীর কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন চান মিয়া। ওই টাকা দিতে না পারায় আকলিমার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে চান মিয়া ও তাঁর বোনজামাই জালাল মিয়া তাঁকে লাঠি ও লোহার রড দিয়ে মারধর করেন বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার। পরে আকলিমা বাবার বাড়িতে চলে যান। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর আকলিমা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে প্রথমে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে তাঁকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় তাঁকে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে ২১ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে মাধবপুরে নিজ বাড়ির কাছাকাছি সড়কে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর আকলিমার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার।

আকলিমার মৃত্যুর পর রাতেই হবিগঞ্জ আইনজীবী সমিতির শিক্ষানবিশ আইনজীবী কামাল খান মাধবপুর থানায় গিয়ে নিহতের ভাই সুমন চৌধুরীকে বাদী করে একটি লিখিত অভিযোগ তৈরি করান বলে জানা গেছে। অভিযোগে চান মিয়া চৌধুরী, তাঁর বোনজামাই জালাল মিয়াসহ পাঁচজনের নাম ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পরিবারের দাবি, কামাল খান পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে চান মিয়াকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। পরে তাঁকে থানায় নেওয়া হলেও সকালে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে কী কারণে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আকলিমার মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের বিষয়টি আলোচনায় এলেও শেষ পর্যন্ত তা করা হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবি করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনের আবেদন করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আকলিমার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সুদি ব্যবসায়ী নানু মিয়া, সেলিম মিয়া, বিএনপি নেতা কবির খান চৌধুরী, জালাল মিয়াসহ এক পীরের মধ্যস্থতায় সালিশ বসার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ওই সালিশের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১৫ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা কবির খান চৌধুরী। তিনি বলেন, আকলিমার তিন সন্তান এবং চান মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রীর এক সন্তান রয়েছে। এই চার সন্তানের মধ্যে চান মিয়ার সম্পত্তি সমানভাবে বণ্টন করে দেওয়ার বিষয়ে সালিশে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া অন্য কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে, নানু মিয়া বলেন, ওই নারীর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল। আপস-মীমাংসার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। এ বিষয়ে তাঁর পীর সব জানেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে পীরের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য জহুর লাল সাহাজি জানান, চান মিয়া তাঁর স্ত্রীকে মারধর করেছেন বলে তাঁকে জানানো হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সালিশে চান মিয়ার সম্পত্তি ভাগ-বণ্টন করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি চিকিৎসার খরচ বাবদ নিহতের ভাইকে এক লাখ টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে ইউপি সদস্য স্পষ্ট করে জানান, তিনি ওই সালিশে উপস্থিত ছিলেন না।

আকলিমার মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মাধবপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কবির জানান, খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তবে চান মিয়াকে তিনি থানায় নিয়ে আসেননি বলে দাবি করেন। এসআই কবির আরও জানান, বাদীপক্ষের লোকজন অভিযুক্তকে ধরে থানায় নিয়ে এসেছিলেন। এরপর কী হয়েছে, তা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ডিউটি অফিসার বলতে পারবেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত চান মিয়া নিজেই এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন, তাঁকে বাড়ি থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।

এ বিষয়ে মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল রানা জানান, তিনি অভিযোগের কোনো কপি পাননি। অভিযুক্তকে ধরে থানায় নিয়ে আসার বিষয়টিও অস্বীকার করেন তিনি। বিস্তারিত জানতে বাদীপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন ওসি।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, আকলিমার মৃত্যুর ঘটনায় মামলা-মোকদ্দমা না করতে তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।

একজন অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনায় নির্যাতনের অভিযোগ, ময়নাতদন্ত না হওয়া, অভিযুক্তকে থানায় নেওয়া নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং সালিশের মাধ্যমে আপসের অভিযোগ, সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

নিহতের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং অভিযুক্তকে থানায় নেওয়ার পর কী ঘটেছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।