সোমবার

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১১ কার্তিক, ১৪৩৩

দোয়ারিকা-শিকারপুর সেতুর টোলে ৫৩ কোটি টাকার গরমিলের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৫৮

শেয়ার

দোয়ারিকা-শিকারপুর সেতুর টোলে ৫৩ কোটি টাকার গরমিলের অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

বরিশালের দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুর টোল আদায় এবং সরকারি কোষাগারে জমার হিসাবে ৫৩ কোটি টাকার পার্থক্যের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সেতু দুটি থেকে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা টোল আদায় হলেও সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো হয়েছে প্রায় ৪২ কোটি টাকা। এ ঘটনায় বরিশাল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর নির্দেশে প্রকৃত আদায়ের তুলনায় কম অর্থ সরকারি হিসাবে জমা দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। তবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি যাচাই ও তদন্ত প্রয়োজন।

ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর দোয়ারিকা সেতু এবং মেজর এম এ জলিল শিকারপুর সেতু দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। বাবুগঞ্জের সুগন্ধা নদীর ওপর ৩৯০ মিটার দীর্ঘ দোয়ারিকা সেতু এবং উজিরপুরের সন্ধ্যা নদীর ওপর ২৯২ মিটার দীর্ঘ শিকারপুর সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১২ কোটি টাকা। ২০০৩ সালের ১২ এপ্রিল যান চলাচলের জন্য সেতু দুটি উদ্বোধন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের দুই বীরের স্মরণে সেতু দুটির নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিদিন এই দুই সেতু দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে।

খাস কালেকশনে টোল আদায় ও জমার হিসাবে বড় পার্থক্য

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়কের ১৪৮তম কিলোমিটারে অবস্থিত দোয়ারিকা সেতু এবং ১৪৬তম কিলোমিটারে অবস্থিত শিকারপুর সেতুর আগের ইজারার মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের ৩০ জুন। এর আগে ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক হাজার ৯৬ দিনের জন্য মেসার্স রহমান ট্রেডার্সকে ভ্যাট ও আয়করসহ ৫৮ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায় সেতু দুটির টোল আদায়ের ইজারা দেওয়া হয়েছিল।

২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালুর পর দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুর টোল আয় প্রায় চারগুণ বেড়ে যায়। সে সময় প্রতিদিন সর্বনিম্ন ৯ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত টোল আদায়ের তথ্য প্রকাশ পায়। আগের ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন ইজারার মূল্য নির্ধারণে মূল্যায়ন ছাড়াই আগের মূল্যের সঙ্গে মাত্র ৭ শতাংশ যোগ করে অনুমোদনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।

আগের ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিন বছরের জন্য ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ইজারা মূল্যে চাঁদনী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসকে নতুন ইজারাদার হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় সওজ কর্তৃপক্ষ তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত করে।

এরপর নতুন ইজারা কার্যকর না করে সওজের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় শুরু হয়। এ পদ্ধতি খাস কালেকশন নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায় প্রতিদিন কত টাকা আদায় হয়েছে, কত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে এবং অবশিষ্ট অর্থ কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, তার হিসাব সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত খাস কালেকশন ব্যবস্থায় দুই সেতু থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ টাকার বেশি টোল আদায় হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি কোষাগারে দৈনিক গড়ে ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা জমা দেখানো হয়েছে। এ সময়ে মোট আদায় প্রায় ৯৫ কোটি টাকা এবং সরকারি কোষাগারে জমার পরিমাণ প্রায় ৪২ কোটি টাকা। দুই হিসাবের ব্যবধান প্রায় ৫৩ কোটি টাকা।

তবে এই পার্থক্যের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পেতে টোল আদায়ের রসিদ, ব্যাংকে জমার চালান, দৈনিক হিসাববই, যানবাহন চলাচলের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ৯৫ কোটি টাকা আদায়ের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ৪২ কোটি টাকা জমার তথ্য কোন সময়সীমা ও সরকারি হিসাবের ভিত্তিতে তৈরি, তা মিলিয়ে দেখা জরুরি।

নতুন ইজারা নিয়ে ৮৫ কোটি টাকার প্রস্তাব

সেতু দুটির নতুন ইজারা প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ নবম আহ্বানে সর্বোচ্চ দরদাতা আতিক কনস্ট্রাকশনের অনুকূলে তিন বছরের জন্য ৮৫ কোটি টাকায় ইজারা অনুমোদনের সুপারিশ করেন সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। ওই চিঠিতে খাস কালেকশনের ভিত্তিতে তিন বছরে সরকারি আয় ৬৩ কোটি টাকা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।

আতিক কনস্ট্রাকশনের প্রস্তাবিত ৮৫ কোটি টাকার ইজারা মূল্য সম্ভাব্য ৬৩ কোটি টাকার রাজস্বের চেয়ে ২২ কোটি টাকা বেশি। শতকরা হিসাবে প্রস্তাবিত ইজারা মূল্য সম্ভাব্য রাজস্বের তুলনায় প্রায় ৩৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি। তবে সম্ভাব্য খাস কালেকশনের আয় ও ইজারা মূল্যের এই পার্থক্যকে সরাসরি সরকারি ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করার আগে ইজারার শর্ত, আদায়ব্যয়, অনুমোদনের সময় এবং অর্থ জমার নিয়মসহ সংশ্লিষ্ট হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।

খাস কালেকশন ও ইজারা ব্যবস্থার রাজস্বের পার্থক্য এবং ইজারা কার্যকরে বিলম্বের আর্থিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি নথিতে উল্লেখিত ৬৩ কোটি টাকার সম্ভাব্য আয় এবং ৮৫ কোটি টাকার প্রস্তাবের ভিত্তি যাচাই করলে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।

হিসাব যাচাই ও তদন্তের প্রয়োজন

দুই সেতুর টোল আদায় নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিনের টোল আদায়ের রেজিস্টার, টিকিটের হিসাব এবং ব্যাংকে জমা দেওয়ার চালান মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো ৪২ কোটি টাকার সঙ্গে সওজের হিসাববই ও ব্যাংক বিবরণী যাচাইয়ের পাশাপাশি টোল আদায়ের অর্থ পরিবহন, কর্মীদের পারিশ্রমিক বা অন্য অনুমোদিত খাতে ব্যয় হয়ে থাকলে তার নথিও পরীক্ষা করা দরকার।

এ ছাড়া ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ইজারা অনুমোদন, প্রথম কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা, জামানত বাজেয়াপ্তকরণ এবং পরবর্তী ইজারা প্রক্রিয়ার নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের ১২ মার্চের চিঠিতে উল্লেখিত ৬৩ কোটি টাকার হিসাব এবং আতিক কনস্ট্রাকশনের ৮৫ কোটি টাকার প্রস্তাবের ভিত্তিও যাচাই করা জরুরি।

সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫ ধারার অধীনে মামলা হতে পারে বলে আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ধারায় সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশন বা সওজ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপনের আইনি পথও রয়েছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তাঁর দায়িত্ব, অনুমোদনসংক্রান্ত নথি এবং আর্থিক হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তা ও টোল আদায়ের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ। উত্থাপিত হিসাব অনুযায়ী ৫৩ কোটি টাকার পার্থক্যের অভিযোগ থাকলেও অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে কারা দায়ী, তা নির্ধারণে প্রামাণ্য নথি ও তদন্তের ফল প্রয়োজন।