কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর পর পর্যটনকেন্দ্রটির হোটেল-রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কক্সবাজার শহর, মেরিন ড্রাইভ ও সেন্ট মার্টিনে গড়ে ওঠা অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও জরুরি নির্গমনপথ নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্রও নেই।
গত ১৭ অক্টোবর টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে প্রাণ হারান ১০ জন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন রাজধানীর খিলগাঁওয়ের পশ্চিম নন্দীপাড়ার বাসিন্দা মেহেরুননেসা মিলার স্বজন। ওই ঘটনায় মেহেরুননেসা, তাঁর স্বামী মাসুদ মিয়া এবং আরেক স্বজন আশিকুল ইসলাম জানালার কাচ ভেঙে দোতলা থেকে লাফিয়ে প্রাণে বাঁচলেও আহত হন। আগুনে তাঁদের অন্য স্বজনদের পুড়ে মারা যাওয়ার দৃশ্য দেখতে হয় তাঁদের।
স্ত্রীকে হারিয়ে প্রাণে বেঁচে ফেরা আশিকুল ইসলাম জানান, রিসোর্টটিতে জরুরি বের হওয়ার রাস্তা ছিল না। তাঁরা তিনজন জানালার কাচ ভেঙে বাইরে লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন।
সাত শতাধিক হোটেল-রিসোর্টে নানা অনিয়মের অভিযোগ
হোটেল মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর কক্সবাজারে ৮০ থেকে ৯০ লাখ পর্যটক বেড়াতে আসেন। গত এক দশকে শহরের পাশাপাশি পাহাড় ও সমুদ্রঘেঁষা মেরিন ড্রাইভ এলাকাতেও পর্যটন ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে। এসব এলাকায় সাত শতাধিক আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের বিরুদ্ধে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
কক্সবাজার শহরের হোটেল-মোটেল জোনের সুগন্ধা ও কলাতলী এলাকার তিনটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল-রিসোর্ট এবং ২০টি মাঝারি ও ছোট আকারের হোটেল-রিসোর্ট ঘুরে বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে।
কক্সবাজারে কর্মরত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আহমদ গিয়াস বলেন, তারকা মানের হোটেল ছাড়া অধিকাংশ হোটেলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে পয়ঃশোধনাগারও নেই। দুর্ঘটনার সময় বের হওয়ার জরুরি পথও অনেক প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত। প্রশাসনের নজরদারির অভাবে দিনের পর দিন এসব প্রতিষ্ঠান চলছে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম জানান, তারকা মানের সব হোটেলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে। মাঝারি মানের ৫৩টি হোটেল-রিসোর্ট অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে। যাচাই-বাছাই শেষে ২৩টিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। অন্যদের নোটিশ দেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) সচিব সানজিদা বেগম বলেন, অধিকাংশ হোটেলে অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকবল না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় প্রায়ই এসব বিষয় নজরে আসে।
কউকের তথ্য অনুযায়ী, মেরিন ড্রাইভ সড়কে দোকানপাটসহ প্রায় ২ হাজার ৫০০টি স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫০টি অবৈধ প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তর চলতি বছরের এপ্রিল থেকে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ দিয়েছে। টুপটুপ রিসোর্টসহ ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানাও করা হয়েছে।
অনুমোদনবিহীন স্থাপনা সরিয়ে ফেলার জন্য সম্প্রতি ২৫০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন। তিনি বলেন, শিগগিরই সব ধরনের অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাত্র ৪৪টি হোটেল-রিসোর্টের পরিবেশগত ছাড়পত্র
১৯৯৯ সালে কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। এসব এলাকায় স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরও কঠোর। এ ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ অনুযায়ী, ২০টির বেশি কক্ষ রয়েছে এমন রিসোর্টের পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, মাত্র ৪৪টি হোটেল-রিসোর্টের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে। আর পয়ঃশোধনাগার বা স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট রয়েছে মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠানে।
প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
কক্সবাজারে রাতারাতি হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠলেও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর স্থানীয় প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এসব অনিয়ম থেকে সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান প্রশাসনের যথাযথ নজরদারির অভাবের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের জন্য কমপক্ষে ১৭ থেকে ১৮টি সরকারি দপ্তরে যেতে হয়। এতে উদ্যোক্তারা নানা হয়রানির শিকার হন। এই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট তৈরি করছেন। টুপটুপ রিসোর্টের ঘটনা কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের নিরাপত্তার ঘাটতি সামনে এনেছে।
সুগন্ধা পয়েন্টের একটি মাঝারি মানের হোটেলের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অবৈধভাবে চললেও অনেক দপ্তর এসব ব্যবসা থেকে সুবিধা নেয়।
রাতারাতি হোটেল-রিসোর্ট গড়ে ওঠার বিষয়টি স্বীকার করে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান বলেন, জনবলসংকটের কারণে সব অবৈধ স্থাপনা ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এখন কউক ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে যেসব অনিয়ম চিহ্নিত হচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনিয়ম সংশোধনে ছয় মাস সময় চান মালিকেরা
গত শনিবার নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন পর্যটনসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। বৈঠকে হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর মালিকেরা অগ্নিনির্বাপণ লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন অনিয়ম সংশোধনের জন্য ছয় মাস সময় চেয়েছেন। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সেবা পেতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর দাবি জানিয়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলও নিরাপদ পর্যটন নগরী গড়ে তুলতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালুর পক্ষে মত দেন।
জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর দাবি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কমিটির সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
তিনি আরও বলেন, নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করতে যেসব অবৈধ হোটেল-রিসোর্টে ন্যূনতম নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন:







