সবুজ ফসলের মাঠ, পুকুর, ফলের বাগান আর অতীতের বসতির স্মৃতিচিহ্ন। গ্রামবাংলার চিরচেনা এমন দৃশ্যের দেখা মেলে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার মঙ্গলপুর গ্রামে । কোথাও পুরোনো বসতভিটার চিহ্ন, কোথাও কৃষিজমি আবার এরই মধ্যে মানুষের বসবাসও রয়েছে। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রামটিকে ‘মানুষশূন্য’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, মঙ্গলপুরের বাস্তব চিত্র যাচাই না করেই এমন প্রচার চালানো হচ্ছে, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
কোটচাঁদপুর উপজেলা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের মঙ্গলপুর গ্রামকে ঘিরে স্থানীয়দের রয়েছে নানা স্মৃতি ও ইতিহাস। তাঁদের ভাষ্য, একসময় গ্রামটিতে বিভিন্ন পরিবারের বসবাস ছিল। কালের বিবর্তনে পুরোনো বসতবাড়ির কিছু অংশ বিলীন হয়েছে, বদলেছে জনবসতির চিত্রও। তবে পুরোনো বাড়িঘর হারিয়ে যাওয়া আর পুরো গ্রাম জনশূন্য হয়ে যাওয়া এক কথা নয়। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে মঙ্গলপুর গ্রামে মানুষ বসবাস করছেন। কৃষিকাজসহ নানা প্রয়োজনে গ্রামটির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগও রয়েছে।
গ্রামটির অতীত জনবসতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে নানা কথা। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় মঙ্গলপুর গ্রামে হাজরা ঠাকুর ও নিপিন ঠাকুরসহ কয়েকটি পরিবারের বসবাস ছিল। প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ বছর আগে পরিবারগুলো গ্রাম ছেড়ে চলে যায় বলে তারা শুনেছেন। তবে কী কারণে তারা চলে গিয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি তারা।
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, বলাবাড়িয়া গ্রামের মঙ্গল পাঠান নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম অনুসারে মঙ্গলপুরের নামকরণ হয়েছে। ওই ব্যক্তির একটি বড় বাড়ি ছিল এবং তাঁর পরিবারের কবরও গ্রামটিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একসময় গ্রামটিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল বলেও জানান তারা।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা শামীম আহমেদ, ওলিউর রহমান ও নূরনবী বলেন, গ্রামটিতে মানুষের বসবাস থাকা সত্ত্বেও একে ‘মানুষশূন্য’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। তাঁদের মতে, পুরোনো বসতবাড়ির চিহ্ন দেখে একটি গ্রামের বর্তমান অবস্থা নির্ধারণ করা ঠিক নয়। প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে সরেজমিনে গিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলার আহ্বান জানান তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াহেদ মণ্ডল বলেন, ১৯৭৬ সালে তিনি মঙ্গলপুর গ্রামের মাঠে একটি ঈদগাহ নির্মাণ করেছিলেন, যা এখনো রয়েছে। তাঁর দাবি, গ্রামটিতে অনেক মানুষ বসবাস করলেও তাঁদের বাস্তব চিত্র যথাযথভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না।
এদিকে সিনিয়র সাংবাদিক সিরাজ মল্লিক মঙ্গলপুরকে মানুষশূন্য গ্রাম হিসেবে প্রচারের সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, কোনো গ্রাম সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশের আগে সরেজমিনে গিয়ে বাস্তব অবস্থা যাচাই করা জরুরি। এতে ভুল তথ্য প্রচার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এড়ানো সম্ভব।
এ বিষয়ে ৮ নম্বর হাকিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মঙ্গলপুরকে মানুষশূন্য গ্রাম হিসেবে প্রচারিত হতে দেখে তাঁর খারাপ লেগেছে। গ্রামটিতে তাঁর অনেক ভোটার রয়েছেন, যাঁরা তাঁকে বারবার নির্বাচিত করেছেন। পুরোনো বসতবাড়ি না থাকলেই কোনো গ্রামে মানুষ নেই এমন ধারণা সঠিক নয়। মঙ্গলপুরের প্রকৃত অবস্থা দেখতে আগ্রহীদের সরেজমিনে গ্রামটি পরিদর্শনের আহ্বান জানান তিনি।
আরও পড়ুন:







