শুক্রবার

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৮ কার্তিক, ১৪৩৩

ফুটপাতের খাবার দোকানে নিবন্ধন নিয়ে স্বস্তি-শঙ্কায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:২২

শেয়ার

ফুটপাতের খাবার দোকানে নিবন্ধন নিয়ে স্বস্তি-শঙ্কায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা
ছবি সংগৃহীত

ফুটপাত ও রাস্তার পাশে খাবারের দোকান চালাতে সরকারি নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তবে নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় নতুন ভোগান্তি তৈরি হবে কি না, চাঁদাবাজি বন্ধ হবে কি না এবং ব্যবসা পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে উঠবে কি না, তা নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

রাজধানীর ফার্মগেটে আনন্দ সিনেমা হলের সামনে আখের রস বিক্রি করেন আজগর আলী। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরদিন তিনি জানান, নিবন্ধন করতে হলে তিনি তা করবেন। তার আশা, সরকারি অনুমতি থাকলে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলা সহজ হবে।

আজগর আলী বলেন, নিবন্ধন করার পর কেউ চাঁদা নিতে এলে তিনি বলবেন, সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে দোকান বসিয়েছেন, তাই অন্যদের চাঁদা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

পান্থপথে চিতই পিঠা বিক্রি করেন ষাটোর্ধ্ব আমেনা বেগম। চার দিন আগে সিটি করপোরেশনের লোকজন তার দোকান তুলে দিয়েছিলেন। সেই শঙ্কা নিয়েই বৃহস্পতিবার আবার দোকান বসিয়েছেন তিনি। সরকারি নিবন্ধন নিয়ে ব্যবসা চালানোর সুযোগ তৈরি হলে সেটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন আমেনা।

তার পাশেই জিলাপি বিক্রি করতেন কাশেম মিয়া। তবে সিটি করপোরেশনের চাপে চার দিন ধরে তার দোকান বন্ধ। নিয়মকানুন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সব নিয়ম যেন শুধু গরিবদের জন্য। সব সময় গরিবের ওপরই আঘাত আসে।

অন্যদিকে, নিবন্ধনের প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন রাজধানীর কারওয়ান বাজারের শিঙাড়া ও সমুচা বিক্রেতা মো. হোসেন। তার আশঙ্কা, কোথায় যেতে হবে এবং কীভাবে নিবন্ধন করতে হবে, তা নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানির মুখে পড়তে হতে পারে।

১ নভেম্বর থেকে আবেদন শুরু

বুধবার বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, ফুটপাত ও রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি, শিঙাড়া, পিঁয়াজু, ফলের রসসহ যেকোনো ধরনের খাবারের দোকান পরিচালনা করতে সরকারি নিবন্ধন নিতে হবে। রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকেও নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে। নিবন্ধন না নিলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের শাস্তির মুখে পড়তে হবে।

এ ছাড়া শিশুদের ফর্মুলা দুধ, বয়স্ক ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ খাবার, স্বাস্থ্যসহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যাল উৎপাদনের ব্যবসায় নিবন্ধনের পাশাপাশি লাইসেন্সও নিতে হবে।

আগামী ১ নভেম্বর থেকে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের জন্য আবেদন শুরু হবে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভাসমান দোকানগুলোকে প্রথম পর্যায়েই নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে না। আবেদন পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে তথ্য যাচাই করবেন। এরপর লাইসেন্স দেওয়া হবে। ভাসমান ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনের জন্য কোনো ফি নেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

প্রক্রিয়া নিয়ে রেস্তোরাঁ মালিকদের আপত্তি

ফুটপাতের অনেক দোকানি উদ্যোগটিকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান।

তার মতে, নিবন্ধন ও লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় এতে আর্থিক লেনদেন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়তে পারে। ছোট ব্যবসায়ীদের ব্যবসা পরিচালনা কঠিন করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুবিধা তৈরির ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ইমরান হাসানের ভাষ্য, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

নিরাপদ খাদ্যের পাশাপাশি হয়রানি বন্ধের তাগিদ

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান মনে করেন, নিবন্ধনের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য তৈরির শর্ত যুক্ত করা হলে খাদ্যের মান উন্নত করতে সহায়তা করবে।

তিনি উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা আনতে এ ধরনের ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে।

তবে নিবন্ধন বা লাইসেন্স নিতে গিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যেন ভোগান্তিতে না পড়েন এবং ঘুষ বা মাসোহারা দিতে বাধ্য না হন, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক এই সচিব।

নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্য থাকলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রক্রিয়াটি কতটা সহজ হবে এবং এর ফলে চাঁদাবাজি ও হয়রানি কমবে কি না, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।