বৃহস্পতিবার

২২ অক্টোবর, ২০২৬ ৭ কার্তিক, ১৪৩৩

অপহরণের চার দিন পর টেকনাফ থেকে উদ্ধার বাঁশখালীর ব্যবসায়ী হাসান

শিব্বির আহমদ রানা,বাঁশখালী প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:৩৭

শেয়ার

অপহরণের চার দিন পর টেকনাফ থেকে উদ্ধার বাঁশখালীর ব্যবসায়ী হাসান
ছবি: বাংলা এডিশন

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর প্রেমবাজার থেকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (SRB) সদস্য পরিচয়ে অপহৃত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। অপহরণের পর তাঁকে আটকে রেখে পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। এ ঘটনায় চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা পুলিশ।

বৃহস্পতিবার সকালে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ জানায়, গত ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়নের প্রেমবাজারে হাসানের মালিকানাধীন মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের হার্ডওয়্যারের দোকানে এ ঘটনা ঘটে। কালো পোশাকের ওপর SRB লেখা কটি পরা, মাথায় কালো ক্যাপ ও মুখে মাস্কধারী কয়েকজন ব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করেন। তাঁরা নিজেদের SRB সদস্য পরিচয় দিয়ে হাসানের যমজ ভাই মো. হোছাইনের ছবি দেখিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেন।

একপর্যায়ে হাসান নিজের পরিচয় দিলে তাঁরা তাঁর দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরান। পরে টানাহেঁচড়া করে তাঁকে দোকান থেকে বের করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যান। এরপর বিভিন্ন যানবাহনে স্থানান্তর করে তাঁকে কক্সবাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

মুক্তিপণ দাবি, হত্যার হুমকি: অপহরণের পর একই দিন রাতে হাসানের স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের মুঠোফোনে বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে কল আসতে থাকে। এ সময় অপহরণকারীরা হাসানকে মুক্তি দেয়ার বিনিময়ে ২০ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে তাঁকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় হাসানের ভাই মো. হোছাইনের এজাহারের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা হয়। এরপর অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধার এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে মাঠে নামে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা পুলিশ।

তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান: চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের (বিপিএম) নির্দেশনায় সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান ও জেলা গোয়েন্দা শাখার ওসি মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে একাধিক আভিযানিক দল গঠন করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও ঘটনার পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপহরণকারীদের শনাক্ত এবং তাঁদের অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা চালায় পুলিশ।

এর ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর থানার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২১ অক্টোবর ভোর আনুমানিক চারটার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকেই অপহরণকারীদের হেফাজত থেকে ব্যবসায়ী হাসানকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

গ্রেপ্তার ছয়জন, জব্দ সরঞ্জাম: এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার মিজানুর রহমান, উখিয়া উপজেলার জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনু, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার মো. আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা মো. ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন।

তাঁদের কাছ থেকে অপহরণে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কার, পাঁচটি কালো রঙের SRB লেখা কটি, দুটি ভুয়া SRB পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়েছে।

ভুয়া SRB পরিচয়ে চক্র গড়ার অভিযোগ: পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, গ্রেপ্তার সুমন মুন্সি অতীতে উখিয়া এলাকায় SRB-তে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে তিনি চাকরিচ্যুত হন এবং কারাভোগ করেন বলে জানা গেছে। কারাগারে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে পরে তিনি ভুয়া SRB পরিচয় ব্যবহার করে একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে পুলিশের দাবি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সুমনকে তথ্য দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সুমন ও তাঁর সহযোগীরা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনুর বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের তিনটি মামলা, ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি মামলা এবং আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে।

অপহরণের ঘটনায় চক্রটির অন্য সদস্যদের সম্পৃক্ততা এবং তাদের অপরাধের বিস্তৃতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।