বৃহস্পতিবার

২২ অক্টোবর, ২০২৬ ৭ কার্তিক, ১৪৩৩

সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, জমা পড়েছে ৫০০ আবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৫৩

শেয়ার

সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, জমা পড়েছে ৫০০ আবেদন
ছবি সংগৃহীত

সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। নীতিমালা লঙ্ঘন করে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া, একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে নিয়োগ এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে অনিয়মের অভিযোগে কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৫০০টি আবেদন জমা পড়েছে। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করছে মন্ত্রণালয়। গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ ১০ জন ডিলারের নিয়োগ পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বিভিন্ন এলাকার আবেদনকারীরা ডিলার নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ জানাতে মন্ত্রণালয়ে আসছেন। গত রবিবার সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত নারী আসনের তিনজন সংসদ সদস্য এবং কৃষক দলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের অভিযোগ জানান।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটির আগে শেষ কর্মদিবস গত সোমবারও অনিয়মের অভিযোগে পাঁচ থেকে ছয়টি আবেদন জমা পড়ে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর আগে একই ধরনের প্রায় ৫০০টি আবেদন জমা হয়েছিল।

গত সোমবার ঝিনাইদহে এক অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, আইনি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে।

চার বিষয়ে অভিযোগ যাচাই করছে মন্ত্রণালয়

সার ডিলার নিয়োগে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে অনিয়ম, একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ, ফ্যাসিস্টদলীয় ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগের সুপারিশের নেপথ্য কারণ এবং নীতিমালা লঙ্ঘন করে কাউকে ডিলার হিসেবে নির্বাচনের কারণ অনুসন্ধান।

মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রভাবশালী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা এবং আমলাদের কেউ কেউ পছন্দের ব্যক্তিদের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে কৃষিমন্ত্রী ও সচিবের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তবে এসব তদবির আমলে নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের দাবি। বাছাই কমিটির তালিকায় প্রথম স্থানে থাকা ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল বলেও জানান তাঁরা।

কৃষি সচিব সেলিম খান জানান, নীতিমালা ও জেলার সুপারিশের ভিত্তিতে সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির পর বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ আসছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেলে কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জমা পড়া প্রায় ৫০০টি আবেদনের মধ্যে আমলযোগ্য অভিযোগের সংখ্যা খুবই কম। প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক জেলা বগুড়া থেকেও বেশ কিছু আবেদন এসেছে। গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১০ জন ডিলারের নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি)। ডিলার নিয়োগের সুপারিশ ও যাচাই-বাছাইয়ে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আবেদনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির হয়েছে। কোথাও কোথাও সংসদ সদস্যদের আধাসরকারি চিঠি বা ডিও লেটার ব্যবহার এবং ইউএনও ও ডিসির কাছে তদবিরের জন্য অর্থ লেনদেনের চুক্তির অভিযোগও উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকেরা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ তদন্তে কয়েকটি জেলার প্রশাসন কমিটি গঠন করেছে। গত ১৩ অক্টোবর যশোরের জেলা প্রশাসক আশেক এলাহী তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। মনিরামপুর, অভয়নগর ও চৌগাছা উপজেলার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোতে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব গুদাম না থাকা ব্যক্তি ও অনভিজ্ঞদের ডিলার হিসেবে সুপারিশ, ইউএনওর তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা ব্যক্তিকে ডিসির সুপারিশে প্রথম স্থানে নিয়ে আসা, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া।

পাইকগাছায় তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ

খুলনার পাইকগাছায় সার ডিলার নিয়োগে অস্বচ্ছতা, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, উপজেলা কমিটির পাঠানো তালিকা পরিবর্তনের জন্য জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত ঊর্ধ্বতন মহলের কথা বলে চাপ দেন। পরে জেলা বিএনপি ও প্রশাসনের প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে কয়েকটি ইউনিয়নে যোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে তালিকার নিচের দিকে থাকা ব্যক্তিদের ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কপিলমুনি ইউনিয়নে প্রথম স্থানে থাকা মেসার্স পপি এন্টারপ্রাইজের পরিবর্তে তৃতীয় স্থানে থাকা মেসার্স দৃশান এন্টারপ্রাইজকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ষোলাদানা ইউনিয়নে এসকেআর এন্টারপ্রাইজের পরিবর্তে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসার্স সুমি এন্টারপ্রাইজ এবং গড়াইখালী ইউনিয়নে মেসার্স যাবিন স্টোরের পরিবর্তে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসার্স অর্ণব এন্টারপ্রাইজকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর ইউএনও ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত তালিকার বাইরে দলীয় বিবেচনা ও অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত জানান, কমিটির বিবেচনা ও নীতিমালা অনুযায়ী যাঁকে প্রথম স্থানে রাখার প্রয়োজন, তাঁকেই রাখা হয়েছে। এরপরও সুপারিশে অনিয়ম থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাঘারপাড়া ও ডুমুরিয়ায় নিয়োগ নিয়ে আপত্তি

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ৮ নম্বর বাসুয়াড়ী ইউনিয়নে হাবিবুর রহমানকে সার ডিলারশিপ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন। তাঁর অভিযোগ, একাধিক প্রতারণা, অস্ত্র ও মাদক মামলার আসামি এবং নিজস্ব গুদামঘর নেই—এমন একজনকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে।

তবে হাবিবুর রহমান তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করায় প্রতিপক্ষরা মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন। সব নিয়ম মেনেই তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া বাজারে মেসার্স মোল্ল্যা কৃষি ভান্ডারের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন বিএনপি নেতার ছেলে রিয়াদ মোহাম্মদ। তাঁর নিজস্ব সার বিক্রির দোকান ও গুদাম নেই বলে অভিযোগ তুলে ডিলারশিপ বাতিলের আবেদন করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সবুজ মোড়ল।

অন্যদিকে, ডুমুরিয়ার মাগুরখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি সুকৃতি কুমার মণ্ডলের বিরুদ্ধে একটি মিষ্টির দোকানকে গুদাম হিসেবে দেখিয়ে ডিলারশিপ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সুকৃতি কুমার মণ্ডল অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, দোকানটি অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়া ছিল এবং দ্রুত খালি করা হচ্ছে। আগে আওয়ামী লীগের পদে থাকলেও বর্তমানে বিএনপির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, নিয়ম মেনেই ডিলারশিপ পেয়েছেন।

ডুমুরিয়ায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ইউএনও সবিতা সরকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে ব্যস্ত থাকায় পরে যোগাযোগ করবেন বলে জানান।

ভরা মৌসুমের আগে নিয়োগ জটিলতা নিরসনের তাগিদ

আগামী নভেম্বর থেকে সারের ভরা মৌসুম শুরু হচ্ছে। এ সময় আলু, ভুট্টা, গম ও শীতকালীন সবজি চাষে সারের চাহিদা বাড়ে। তবে ডিলার নিয়োগের জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। মাঠপর্যায়ে সার না পাওয়ার অভিযোগও উঠছে।

সার ব্যবস্থাপনা শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারের মজুতে ঘাটতি নেই। সৌদি আরব, বেলারুশ, মরক্কো ও কানাডা থেকে সার আমদানির কার্যক্রম চলছে। সারের ব্যাপক চাহিদা শুরু হওয়ার আগেই ডিলার নিয়োগের বিষয়টি সমাধানে মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিচ্ছে।

অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা

সার ডিলার নিয়োগে জালিয়াতি, প্রতারণা বা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬, দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর সংশ্লিষ্ট ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অনুপযুক্ত গুদাম দেখিয়ে ডিলারশিপ নেওয়া কিংবা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিলারশিপ বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় এবং সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।