মঙ্গলবার

২০ অক্টোবর, ২০২৬ ৫ কার্তিক, ১৪৩৩

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কিছুই জানতো না পরিবার

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৪৮

শেয়ার

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কিছুই জানতো না পরিবার
ছবি সংগৃহীত

তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র সৌদি আরবে সরকারি হিসাবেই কাজ করছেন প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি, যেখানে প্রতিটি ঘামে লেখা থাকে স্বজনদের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন। তবে সুদূর মক্কার এক মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সম্প্রতি ইসলামী শরিয়া আইন ও রাজকীয় আদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর। কিন্তু চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, আটক, বিচারপ্রক্রিয়া, এমনকি শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এই গোটা ঘটনার বিন্দুমাত্র টেরও পায়নি রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সেই দুই প্রবাসীর একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের ২২ বছর বয়সী যুবক নজরুল ইসলাম। আর অন্যজন সুইটি আক্তার টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের নগর ছাওয়ালী গ্রামের ফজল মিয়ার মেয়ে।

বিরামপুর গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন নজরুল। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে দালালের মাধ্যমে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবের আল মাজাল নামক কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যান তিনি। প্রথম ৬-৭ মাস ভালোভাবেই কাজ করছিলেন মক্কা-মদিনায়।

মক্কার একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামের এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট করার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। ৩ বছর ৩ মাস কারাবন্দি থাকার পর, গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) তাঁদের মৃত্যুদণ্ড ও শিরশ্ছেদ কার্যকর করা হয়, যা পরিবার জানতে পারে কেবল গণমাধ্যমের খবর দেখে।

নজরুলের পরিবারের আক্ষেপ ও দাবি

সন্তানের মৃত্যুর খবর শুনে বাকরুদ্ধ ও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বাবা আব্দুল বাছির। ছেলে কারাগারে থাকাকালে কথা বললেও, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে পরিবারকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। আর মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন মা রহিমা বেগম। দীর্ঘ সন্তান হারানোর বেদনায় মা রহিমা বেগম এখন আকুল আকুতি জানাচ্ছেন, অন্তত নজরুলের মরদেহটি যেন দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে সরকার।

নজরুলের মর্মান্তিক এই মৃত্যুর সংবাদ সহ্য করতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বুধবার রাতে মারা যান তাঁর ফুফু আবেদা বেগম। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বাড়িটিতে ভিড় করছেন প্রতিবেশী ও স্বজনেরা। নজরুলের এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না কেউই। তাদের জোরালো দাবি, তাঁর মরদেহ যেন দ্রুত দেশে এনে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

সুইটির পরিবারে উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা

অন্যদিকে, দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের খবর ও কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে চরম উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন জীবিকার সন্ধানে ২০২৩ সালে সৌদিতে যাওয়া সুইটির পরিবার। প্রথম ৫ মাস কাজ করার পর বছরখানেক আগে সুইটি নিজেই পরিবারকে তার কারাবন্দি হওয়ার খবর দেন। তাঁদের মেয়ে বর্তমানে বেঁচে আছেন নাকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য না পাওয়ায় পরিবারটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।

সুইটির গ্রেপ্তারের কারণ নিয়ে পাওয়া গেছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। পরিবারের দাবি, কাজের জায়গায় অন্য একটি পক্ষের সঙ্গে মারামারির ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশে দেওয়া হয়েছিল। পরিবারের ভাষ্যমতে, গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সুইটির সঙ্গে তাঁদের সর্বশেষ কথা হয়। সে সময় তিনি আগামী দুই মাসের মধ্যে দেশে ফিরে আসার আশা ব্যক্ত করেছিলেন। তবে তাঁর এক বান্ধবীর দাবি অনুযায়ী, এক তরুণের সঙ্গে সম্পর্কের জেরেই তাঁকে আটক করা হয়।

আর মেয়ের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি, সুইটি যদি জীবিত থাকেন, তবে তাকে দ্রুত যেন অক্ষত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। আর যদি শিরশ্ছেদের খবরটি সত্যি হয়ে থাকে, তবে যেন তার মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। সুইটি আক্তার মৃত্যুর খবর সত্য হলে, অবিলম্বে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় আন্তর্জাতিক আইন ও ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ সরকারকে কোনো তথ্য না দিয়েই এই দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

এদিকে, কোনো তথ্য না জানিয়ে দুই প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি জানান, সর্বোচ্চ সাজা কার্যকরের বিষয়ে সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পায়নি। প্রতিমন্ত্রী এটিকে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য একটি বড় শিক্ষা হিসেবে অভিহিত করেন এবং যেকোনো দেশে অবস্থানের ক্ষেত্রে সেই দেশের আইন মেনে চলার আহ্বান জানান।

ঘটনার পরপরই, রবিবার (১৮ অক্টোবর) সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মৃত্যুদণ্ডের কারণ, শিরশ্ছেদ এবং চাকরির বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়ে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হলেও এখনো মেলেনি জবাব। ফলে লাশ আদৌ দেশে ফেরানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে রয়ে গেছে অনিশ্চয়তা।

যে প্রবাসীর উপার্জনে ঘোর অন্ধকার ঘুচে সচ্ছলতা ফেরার কথা ছিল, সেই পরিবারে এখন কেবলই শোকের মাতম। প্রশ্ন উঠছে প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সংকটকালে দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে। এখন দেখার বিষয়, কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সন্তান হারানোর ব্যথায় কাতর বাবা-মায়ের কাছে নজরুল ও সুইটির মরদেহ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় কি না।