জেলা প্রশাসনের কোনো ধরনের অনুমতি নেই, নেই প্রতিবন্ধী সংগঠনের কোনো সম্পৃক্ততাও; তবুও স্থানীয় সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে সাতকানিয়ার একটি মাদ্রাসা ভবনের নিচতলায় চলছে মাসব্যাপী মেলা। আর এই অবৈধ মেলার আড়ালে প্রতিবন্ধী সংগঠনের নামে ভুয়া আবেদন, প্রতারণা এবং মোটা অংকের ঘুষ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে টিম বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মেলায় প্রবেশের মুখে তৈরি করা হয়েছে টিকেট কাউন্টার, জনপ্রতি নেয়া হচ্ছে ২০ টাকা করে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেও পুরো মেলা জুড়েই রয়েছে জমকালো আলোকসজ্জা। দেশীয় শিল্পপণ্য প্রদর্শনী ও উদ্যোক্তা মেলা বলা হলেও সেখানে এ ধরণের কোনো স্টল নেই। মেলার ভেতরে রয়েছে কেবল কয়েকটি খাবারের দোকান, শিশুদের খেলনা আর জুয়েলারির পসরা। আর ভবনের ছাদ থেকে আল কুরআনুল কারিম ইনস্টিটিউটের কোমলমতি শিশুরা তাকিয়ে আছে এই মেলার দিকে। যদিও এ অবৈধ মেলার বিষয়ে ভয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। তবে তাদের অভিযোগের বিষয়টি জানতেন সাতকানিয়া ইউএনও রাজীব দাশ।
অনুসন্ধান বলছে, ‘চট্টগ্রাম প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংগঠন (সিডিডিএস)’-এর নামে রবিবার জেলা প্রশাসকের দপ্তরে মেলার অনুমতি চেয়ে মো: এমরান নামে এক ব্যক্তি আবেদন করেন। ২০ আগস্ট অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক মেলা আয়োজনের অনুমতি প্রদানের বিষয়ে মতামত জানতে চেয়ে চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার ও সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে চিঠি পাঠান।
চিঠিটির অনুলিপিতে মো: এমরানের নামের পাশে মুঠোফোন নম্বর (০১৭১৫০৯৯৬০৩) দেয়া রয়েছে। মেলার অনুমোদনের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে টিম বাংলা এডিশন ফোন নম্বরটি বন্ধ পায়।
আবেদনে দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী, বাদুরতলার আরাকান রোডের ৫৭২ নম্বর বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, প্রায় ১০ বছর আগে এই ভবনে সংগঠনের অফিস থাকলেও ২০১৬ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা জাহিদুল আলম চৌধুরীর মৃত্যুর পর থেকে সংগঠনটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আনোয়ারুল আলম ও অর্থ সম্পাদক ইউসুফ নিশ্চিত করেছেন, এমরান বা এই মেলার সাথে প্রতিবন্ধী সংগঠনের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে আবেদনে মৃত জাহিদুল আলম চৌধুরীর বন্ধ মোবাইল নম্বরটি ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের দাবি, তসলিম হোসেন নামে এক ব্যক্তি এধরনের কাজ করছেন।
চকবাজারের দিদার মার্কেট এলাকায় তসলিমের মুখোমুখি টিম বাংলা এডিশন। তিনি নিজেকে চট্টগ্রাম প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংগঠনের স্বঘোষিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করেছেন। তিনি এর আগেও প্রতারণা ও জালিয়াতি করে জেল খেটেছেন। তিনি প্রথমে এমরানকে না চিনলেও পরে জানান, এমরান তার পরিচিত। তবে তিনি সংগঠনের কেউ নয়। সংগঠনের এই প্যাডে স্বাক্ষর করার অধিকার তার নেই।
অন্যদিকে অভিযুক্ত এমরান দাবি করেছেন, মেলা উদ্বোধন করেছেন খোদ স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং এতে কোনো অবৈধ কিছু নেই। তবে মেলায় টিকেট বিক্রির কথা তিনি স্বীকার করেছেন।
মেলার অনুমতি নিতে ঘুষ লেনদেনের বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর অডিও রেকর্ড হাতে পেয়েছে টিম বাংলা এডিশন। প্রথম অডিওতে সাতকানিয়া ইউএনও রাজীব দাশ আয়োজকদের জানান,মেলার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার পক্ষ থেকে অভিযোগ দেয়া হয়েছে।
পরবর্তীতে আয়োজকদের কথোপকথনে স্পষ্ট হয়, তারা ইউএনওকে দেড় লাখ টাকা দিয়েছেন এবং আরও ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে।
টাকা পাওয়ার পর ইউএনও রাজীব দাশ মেলার অনুমতির বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিবেন বলে আশ্বাস দেন।
ইউএনওর গোপনীয় সহকারী মিজান মেলা সংশ্লিষ্টদের জানান, দুপুর আড়াইটার মধ্যেই প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পৌঁছে যাবে।
২ লাখ টাকার মধ্যে দেড় লাখ টাকা বুঝে পেলেও বাকি ৫০ হাজার টাকা না পাওয়ার আক্ষেপ প্রকাশ করেন মিজান। এসময় তিনি বলেন, মেলার পক্ষে শতভাগ ইতিবাচক প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।
তবে ঘুষের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন মিজান। আর সুনির্দিষ্ট এই অভিযোগের বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজীব দাশ পুরকায়স্থের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্রতিবন্ধী সংগঠনের কেউ না হয়েও এই সংগঠনের মানুষদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মেলা আয়োজন করেছেন এমরান ও তার সহযোগীরা। এই চক্রের প্রতারণা ঠেকাতে অবশেষে জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হয়েছেন অসহায় প্রতিবন্ধী নাগরিকরা। এমরানসহ এই ঘৃণ্য কাজের সাথে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
আরও পড়ুন:







