রবিবার

১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ৩ কার্তিক, ১৪৩৩

শায়েস্তাগঞ্জে শিল্পায়নের চাপে কমছে কৃষিজমি, বাড়ছে পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ

শেখ বেলাল,হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৪৯

শেয়ার

শায়েস্তাগঞ্জে শিল্পায়নের চাপে কমছে কৃষিজমি, বাড়ছে পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
ছবি: বাংলা এডিশন

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক বহুতল ভবন। এসব স্থাপনা নির্মাণে কৃষিজমি ভরাট ও ব্যবহার পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি শিল্পকারখানার সম্ভাব্য পরিবেশদূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভা ও ইউনিয়নের বড়চর মৌজায় প্রায় ৪০ একর কৃষিজমি কিনে ২০২৪ সালে দ্বিতীয় শিল্পপার্ক গড়ে তোলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। এ শিল্পপার্কে উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন নতুন কারখানার ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে একদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও অন্যদিকে কৃষিজমি সংরক্ষণ ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিতভাবে শিল্পায়ন না হলে ভবিষ্যতে কৃষিজমি সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এসব শিল্পকারখানার কারণে এলাকায় কী পরিমাণ দূষণ হচ্ছে কিংবা মানুষের রোগব্যাধি বাড়ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পরিবেশগত সমীক্ষা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান চৌধুরী কামাল জানান, বিদ্যমান পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, নতুন পণ্য বাজারে আনা এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর লক্ষ্যে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার বড়চর মৌজা ও আশপাশের ইউনিয়ন এলাকায় দ্বিতীয় শিল্পপার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বিতীয় শিল্পপার্কে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। এ শিল্পপার্কের অর্থায়নে নিজস্ব মূলধন ও ঋণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

শিল্পপার্কটিতে ওপাল গ্লাসওয়্যার ও কর্কশিট উৎপাদনের জন্য একাধিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওপাল গ্লাসওয়্যার উৎপাদন সম্প্রসারণে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দেশের বাজারে ওপাল গ্লাসওয়্যারের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এ বাজারের বার্ষিক আকার আনুমানিক ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান চৌধুরী কামালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার অলিপুর এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে প্রায় ৩০০ একর কৃষিজমি কিনে প্রথম শিল্পপার্ক গড়ে তোলে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে সেখানে আরও কারখানা স্থাপন করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন শুরু হয়।

বর্তমানে প্রথম শিল্পপার্কে প্রায় ২৫ হাজার নারী-পুরুষ কাজ করছেন বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে বড়চর মৌজায় গড়ে ওঠা দ্বিতীয় শিল্পপার্কেও শ্রমিক নিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির সুপারভাইজার শামসুল আলম সোহেল দ্বিতীয় শিল্পপার্কের কার্যক্রম তদারকির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, এখানে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৫০০ শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে শ্রমিকসংখ্যা আরও বেড়েছে। তবে বর্তমান শ্রমিকসংখ্যার সুনির্দিষ্ট তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

দ্বিতীয় শিল্পপার্কের আশপাশের কৃষিজমি ভবিষ্যতে কেনার বিষয়েও প্রতিষ্ঠানটির চিন্তাভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিল্পাঞ্চলের পরিধি আরও বাড়তে পারে। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট জমির পরিমাণ, ক্রয়প্রক্রিয়া কিংবা সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ অবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিজমি সংরক্ষণ, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের নিয়ম অনুসরণ এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার ফলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ছে, এটি শিল্পায়নের একটি ইতিবাচক দিক। তবে কৃষিনির্ভর এলাকার জমি ক্রমাগত শিল্প ও আবাসিক ব্যবহারে চলে গেলে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের জীবিকা এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ, পানিদূষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে শায়েস্তাগঞ্জের সংশ্লিষ্ট শিল্পপার্কের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে নির্দিষ্ট রোগের প্রকোপ বেড়েছে, এমন কোনো স্বাস্থ্যসমীক্ষার তথ্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

এলাকার কৃষিজমি কতটা কমেছে, শিল্পপার্ক স্থাপনের আগে ও পরে ভূমির ব্যবহার কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং কারখানাগুলো পরিবেশগত শর্ত মেনে চলছে কি না-এসব বিষয় সরেজমিন তদন্তের দাবি রাখে।

শায়েস্তাগঞ্জে শিল্পায়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলেও কৃষিজমি সংরক্ষণ ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত তদারকি, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের বৈধতা যাচাই এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের মাধ্যমে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।