রবিবার

১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ৩ কার্তিক, ১৪৩৩

গার্মেন্টস কর্মীর ছুটি মেলেনি মিলল নিথর দেহ

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:৩৪

শেয়ার

গার্মেন্টস কর্মীর ছুটি মেলেনি মিলল নিথর দেহ
ছবি সংগৃহীত

ভদ্র সমাজে শ্রমিকের কথা কমিক গানের মত

ভব্যের মত মোরা নহি নাকি সুশব্ধ সংযত
আচারে পোশাকে আমাদের নাই ভদ্রের মত চাল
চাল চুলা নাই দারিদ্রে দুঃখে নাচার নাজেহাল…
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী 'শ্রমিক' কবিতার এই নির্মম চরণগুলোই যেন আধুনিক সময়ে এসেও পোশাক খাতের প্রতিটি পরতে পরতে হুবহু মিলে যায়। যে হাত দুটো অমানুষিক খেটে এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, তাদের ভাগ্যে কি জোটে কেবলই অপমান, নিঃশব্দ কান্না আর মৃত্যুর মিছিল?

সুমি আক্তারের মৃত্যু
এই পোশাক খাতের অন্ধকার অলিগলিতে শ্রমিকের জীবনের যে কোনো মূল্য নেই, তার তাজা প্রমাণ মেলে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায়। ডেকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডের সুইং অপারেটর সুমি আক্তার অসুস্থ শরীরেও পেটের তাগিদে কাজে এসেছিলেন। কিন্তু শরীর যখন ভেঙে আসছিল, তখন ছুটির আকুতি জানিয়েও পাননি একটু দয়া।

কারখানার সিসিটিভি ফুটেজ বলছে, বেলা ৫টা ১ মিনিট ৯ সেকেন্ডে অসুস্থ সুমি টেবিলে কাজ করছিলেন। ঠিক ৫টা ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে এক কর্মকর্তা তেড়ে এসে সেলাই মেশিনে আঘাত করেন, অমানবিক ধমক দেন এবং সুমির হাতের কাজ মাটিতে ছুড়ে ফেলেন। সেই পৈশাচিক মানসিকভাবে ভেঙে পড়া সুমি ঠিক ২০ সেকেন্ডের মাথায়, অর্থাৎ ৫টা ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে, কাজের টেবিল থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

রংপুরের ডিমলার বজলার মিয়ার মেয়ে স্বামী সাজ্জাদ হোসেন আর দুই ছেলেকে নিয়ে আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকার সালামের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।

দুপুরে বাসায় গিয়ে অবুঝ ছেলেকে যে মা বলেছিলেন, শরীরটা খুব খারাপ লাগছে, ছুটি দিল না বাবা, বিকেল পার হতেই সেই মায়ের নিথর লাশ ফিরল কারখানার মেডিক্যাল সেন্টার থেকে।

জামাল উদ্দিনের মৃত্যু
সুমির এই নির্মম মৃত্যুর ঠিক দুই দিন আগে বুধবার (১৪ অক্টোবর) আশুলিয়ার শারমিন গ্রুপে ঘটে আরেক রোমহর্ষক ঘটনা। ১০ তলার ছাদ থেকে নিচে আছড়ে ফেলে বা লাফিয়ে পড়ে মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে ৩৯ বছর বয়সী সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার মো. জামাল উদ্দিনের।

গাজীপুর সদর উপজেলার বুরুলিয়া ডুয়েট এলাকার মৃত মো. সেকেন্দার আলীর ছেলে জামাল দুই বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। হাত-পা সম্পূর্ণ ভাঙা, নাক-মুখ দিয়ে অঝোরে রক্তক্ষরণের সেই দৃশ্য তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে স্বজনদের।

পরিবারের অভিযোগ, এটি কোনো আত্মহত্যা নয়। কারখানার একটি শিপমেন্ট বাতিলকে কেন্দ্র করে জিএম মারুফ জুয়েলকে আটকে রেখে মারধরের প্রতিবাদ করায় জামাল উদ্দিনকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। সেই চরম অপমানের আক্রোশেই তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

শ্রমিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান
তবে সুমি কিংবা জামাল একা নন, তৈরি পোশাক খাতে অমানবিক অত্যাচার আর মৃত্যুর এই মিছিল যেন এক নিয়মিত পরিণতিতে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৮ হাজার ৭৩২ জন শ্রমিক। আর কেবল ২০২৫ সালেই কর্মস্থলে প্রাণ গেছে ৭৩৫ জনের।

বিশ্বের অন্য কোনো দেশে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে বারবার সড়ক অবরোধের মতো দৃশ্য দেখা না গেলেও, বাংলাদেশে এটি প্রায় নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আর এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পোশাক কারখানা মালিকদের খামখেয়ালিপনা, সময়মতো বেতন না দেওয়া এবং মজুরি বৃদ্ধি না করা।

অর্থ পাচারের খপ্পর
কিন্তু প্রশ্ন ওঠে—শ্রমিকদের এই রক্তঝরানো অতিরিক্ত খাটুনি আর হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কোটি কোটি টাকা আসলে যায় কোথায়?

তথ্য বলছে, পোশাক খাতের অঢেল লাভ ও শ্রমিকের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে অর্জিত অর্থই ব্যাংকিং জালিয়াতি ও নানা কৌশলে পাচার করা হয়েছে দেশের বাইরে। যার বড় দৃষ্টান্ত নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। হাজার হাজার শ্রমিককে খাটিয়ে ও নির্যাতন করে তিনি ও তাঁর সিন্ডিকেট প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। সিআইডি ও দুদকের অনুসন্ধানে কেবল যুক্তরাজ্যেই মিলেছে ৬৫৬ কোটি টাকার সম্পদ। বর্তমানে তিনি কারান্তরীণ থাকলেও, রক্তচোষা এই ব্যবস্থার বলির পাঁঠা হচ্ছে সুমি আর জামালরা।

প্রতিবাদ ও দাবি
তবে একের পর এক প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড ও এই অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে এখন আর চুপ নেই পোশাক খাতের সংশ্লিষ্টরা। ‘বাংলাদেশ মার্চেন্ডাইজার হাব’ (বিএমএইচ) এবং ‘জাতীয়তাবাদী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর উদ্যোগে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ফুঁসে উঠেছেন সর্বস্তরের কর্মীরা। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে রাজপথে নেমেছেন তারা।

সচেতন মহলের দাবি, শ্রমিকদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চিরতরে বন্ধ করতে হবে এবং তাদের রক্তে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচারের সব পথ রুদ্ধ করতে হবে। অন্যথায়, বছরের পর বছর জমা হওয়া শ্রমিকের চোখের জল ও ক্ষোভের আগুন একদিন এই অন্যায়ের প্রাসাদ ধূলিস্যাৎ করে দেবে।