হামীম গ্রুপের মালিক একে আজাদের ভাইয়ের গার্মেন্টসে কর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু। শারমিন গ্রুপের মার্চেন্ডাইজার জামালের মৃত্যু; সত্য ধামাচাপার অভিযোগ। জামাল হত্যার বিচারের দাবি। আশুলিয়ায় শারমিন গ্রুপে মার্চেন্ডাইজারের মৃত্যু; বিচারের দাবিতে সরব সহকর্মীরা।
আশুলিয়ার নরসিংহপুর, হামিম গ্রুপের ঠিক পাশেই অবস্থিত শারমিন গ্রুপের বহুতল কারখানা ভবন।
ঘটনার বিবরণ
বুধবার (১৪ অক্টোবর), সকাল। কারখানার ১০ তলার ছাদ থেকে নিচে আছড়ে পড়ে মর্মান্তিক পরিণতি। হাত-পা সম্পূর্ণ ভাঙা, নাক-মুখ দিয়ে অঝোরে রক্তক্ষরণের মর্মান্তিক সেই দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো কারখানায়। আপস। পড়ার ফুজেট- সিসিটিভি।
নিহত কর্মকর্তার নাম মো. জামাল উদ্দিন। বয়স ৩৯ বছর। গাজীপুর সদর উপজেলার বুরুলিয়া ডুয়েট এলাকার মৃত মো. সেকেন্দার আলীর ছেলে জামাল উদ্দিন দুই বছর ধরে শারমিন গ্রুপের ডিভিশন-৩-এ সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একটি সুশৃঙ্খল ও প্রতিষ্ঠিত কর্মজীবন হঠাৎ করেই থেমে গেল এক রহস্যজনক ট্র্যাজেডিতে।
গুরুতর অবস্থায় দ্রুত তাঁকে নারী ও শিশু হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিক আলামতে ছাদ থেকে পড়ার প্রমাণ মিলেছে।
মালিকপক্ষ ও পরিবারের অভিযোগ
জানা যায়, হামিম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এ.কে আজাদের আপন ভাইরের প্রতিষ্ঠান শারমিন গ্রুপ। আজাদের ভাইয়ের নাম ইসমাইল হোসেন।
শুরুতেই এটি কোন আত্মহত্যা নয় বরং পরিকল্পিত চরম অপমানের জেরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া বলে নিহতের পরিবারের দাবি।
অভিযোগ উঠেছে, সম্প্রতি কারখানার একটি শিপমেন্ট বাতিলকে কেন্দ্র করে জিএম মারুফ জুয়েলকে আটকে রেখে মারধর করে মালিকপক্ষ। জামাল উদ্দিন এর প্রতিবাদ করলে তাঁকেও প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত ও প্রহার করা হয়। পরিবারের ধারণা, সেই ঘটনার জের ধরেই তাকে হত্যার দিকে ঢেলে দেয়া হয়েছে।
পরিবারের এই গুরুতর অভিযোগের সত্যতা মেলে কারখানার কর্মীদের বক্তব্যেও।
মামলা দায়ের ও পুলিশের ভূমিকা
ঘটনার পর স্বজনরা আশুলিয়া থানায় হত্যা মামলা করতে গেলে অভিযোগ ওঠে, পুলিশ বিষয়টিকে অপমৃত্যু বা অজ্ঞাতনামা মামলা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এর প্রতিবাদে থানার সামনে অবস্থান নেয় ক্ষুব্ধ স্বজনরা।
অবশেষে তীব্র প্রতিবাদের মুখে শারমিন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল হোসেনকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। আসামির তালিকায় রয়েছেন ইসমাইলের ছেলে ও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শারাফ হোসেনসহ আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি।
অভিযোগের বিষয়ে শারমিন গ্রুপ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে কারখানা ভবনে গিয়েও ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যায়নি।
তবে ফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সকালে অফিসে এসে জামাল উদ্দিন ছাদ থেকে লাফ দিয়েছে, এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
গণমাধ্যম ও ধামাচাপার অভিযোগ
ঘটনাটি নিয়ে ‘দ্য ডেইলি স্টার’সহ একাধিক মেইনস্ট্রিম গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করা হলেও, পরবর্তীতে সেসব সরিয়ে নেয়া হয়। এর ফলে পুরো বিষয়টি শুরু থেকেই ধামাচাপা দেয়ার পাঁয়তারা চলছে বলে দাবি করছে ভুক্তভোগী পরিবার। একইসাথে ঘটনাটিকে ভিন্ন দিকে নেয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও দাবি ভুক্তভোগী ওই পরিবারের।
অন্যদিকে, ঘটনার বিষয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
তবে আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন আশুলিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. আবুল কালাম আজাদ।
প্রতিবাদ ও বিচারের দাবি
তৈরি পোশাক খাতের কর্মী জামালের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, কর্মক্ষেত্রে সার্বিক নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে মার্চেন্ডাইজারদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ মার্চেন্ডাইজার হাব’ (বিএমএইচ)।
ঘটনার প্রতিবাদে ও দ্রুত বিচারের দাবিতে সংগঠনটির উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ভবনের সামনে একটি বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
অন্যদিকে, জামালের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে ‘জাতীয়তাবাদী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’।
জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক কর্মসূচিতে সংগঠনটির নেতারা অবিলম্বে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি জানান।
এ সময় সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
এছাড়াও, একই দাবিতে বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের উদ্যোগে একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং সহকর্মীদের সাথে দ্বন্দ্ব বা অপমানের অভিযোগ এ ধরনের মর্মান্তিক পরিণতির জন্ম কেন দেবে, এই প্রশ্ন এখন আশুলিয়ার পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্টদের মুখে মুখে। জামাল হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি সকলের।
আরও পড়ুন:







