সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও ছড়িয়ে ফেসবুক লাইভে জনতাকে জড়ো করার আহ্বান, এরপর গণপিটুনিতে প্রাণহানি। সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এভাবেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, ঢাকার ধামরাইয়ে একাধিক মোটরসাইকেলে এসে পথরোধ করে ছাত্রদলের এক নেতাকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ হামলার এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, উত্তেজিত জনতার পরিচয়ের আড়ালে পরিকল্পিত অপরাধের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না।
চুরি, ছিনতাই, ধর্ম অবমাননা, রাজনৈতিক বিরোধ ও ব্যক্তিগত শত্রুতার অভিযোগে বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ হামলা ও গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। কোথাও সন্দেহের বশে, কোথাও গুজব ছড়িয়ে, আবার কোথাও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে জনতাকে সংঘবদ্ধ করার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীদের পরিচয়ও অজানা নয়। তারপরও সহিংসতা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হচ্ছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যানে পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক মানুষ একযোগে আইন নিজের হাতে তুলে নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষকে সংঘবদ্ধ করার প্রবণতা মোকাবিলায় পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মব সহিংসতা কেবল সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও আইন অমান্যের ফল, নাকি সংঘবদ্ধ অপরাধের কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোনো ঘটনাকে মব সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত করার পর প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও উসকানিদাতাদের ভূমিকা কতটা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
নয় মাসে গণপিটুনিতে ১৭১ জনের মৃত্যু
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সারা দেশে গণপিটুনিতে অন্তত ১৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৬৩ জন মারা গেছেন। চট্টগ্রামে ৩৯ জন এবং খুলনায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির অন্তত ১৩৭টি ঘটনায় ৫৪ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হয়েছেন।
চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগসহ নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতা ঘটেছে। দুই সংগঠনের তথ্য সংগ্রহের সময়সীমা ও পদ্ধতি আলাদা হলেও উভয় পরিসংখ্যানেই জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।
ফেসবুক লাইভের পর শামীমকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীম হত্যাকাণ্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জনতাকে সংঘবদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
নিহতের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের দিন স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের সময় শামীমের কথাবার্তার একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শামীম মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন এবং চিকিৎসা নিচ্ছিলেন বলে দাবি করেছে তার পরিবার।
ছড়িয়ে পড়া অডিওতে ধর্মীয় কটূক্তি রয়েছে দাবি করে স্থানীয় ফজলুল হক ফেসবুক লাইভে এসে তৌহিদী জনতাকে একত্র হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর উত্তেজিত লোকজন শামীমের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, মারধরের পর অসুস্থ অবস্থায় শামীম বিষপান করলে তাকে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ওপর আবারও হামলা করা হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করালেও একদল মানুষ সেখানে হামলা চালায়। চিকিৎসাধীন শামীমকে হাসপাতাল থেকে বের করে মারধর করার অভিযোগও রয়েছে।
গুরুতর অবস্থায় তাকে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাতে নিহতের বড় ভাই বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় ফজলুল হককে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে। পুলিশ এরই মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
ধামরাইয়ে ছাত্রদল নেতাকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ
সাতক্ষীরার ঘটনার পর শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ঢাকার ধামরাইয়ে মাহফুজুর রহমান ইমন (২৮) নামে এক ছাত্রদল নেতাকে প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে ভাড়া করা প্রাইভেটকারে ব্যক্তিগত কাজে যাওয়ার সময় বালিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ৮ থেকে ১০টি মোটরসাইকেলে আসা প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ব্যক্তি তার গাড়ির পথরোধ করেন। পরে তাকে অন্যত্র নিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আহত ইমন ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন।
ইমনের অভিযোগ, চৌহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মোকসেদ ও তার অনুসারীরা এ হামলায় জড়িত। তবে মোকসেদের স্ত্রী ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান পারভীন হাসান প্রীতি মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তার দাবি, মাদক বহনের ঘটনা এবং গাড়িচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়রা ইমনকে ধাওয়া করেছিলেন। পুলিশও গাড়ি থেকে গাঁজা উদ্ধারের দাবি করেছে। তবে ইমন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ঘটনার প্রকৃত কারণ ও হামলাকারীদের দায় তদন্তের বিষয়। একাধিক মোটরসাইকেলে এসে পথরোধ এবং সংঘবদ্ধভাবে কাউকে তুলে নিয়ে হামলার অভিযোগের কারণে ঘটনাটিতে পরিকল্পিত সহিংসতার সম্ভাবনাও সামনে এসেছে।
পরিকল্পিত অপরাধকে সাধারণ মব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) সায়েদুর রহমান বলেন, সংঘবদ্ধভাবে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলেই সেটিকে সাধারণ মব সহিংসতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিকল্পিতভাবে কাউকে হত্যা কিংবা গুরুতর আঘাত করা হলে অপরাধের প্রকৃত ধরন অনুযায়ী তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে কাউকে হত্যা করলে সেটিকে মবের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে অপরাধের গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হবে না। বরং হত্যাকাণ্ড বা সংশ্লিষ্ট গুরুতর অপরাধ হিসেবে তদন্ত করে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করবে পুলিশ।
ধামরাইয়ের ঘটনার প্রসঙ্গে সায়েদুর রহমান বলেন, ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা পরিকল্পিত হামলার বিষয় থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা বের করতে হবে। সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ অন্যায় করলেও তাকে ছাড় না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
বিপুল জনতাকে নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
মব সহিংসতা প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ ব্যাখ্যা করে অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমান বলেন, সমাজের সীমিতসংখ্যক মানুষ আইন ভঙ্গ করলে প্রচলিত পুলিশি সক্ষমতা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষ একযোগে আইন অমান্য করার সিদ্ধান্ত নিলে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হয়ে ওঠে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা শহরের বিপুল জনগোষ্ঠীর মাত্র এক শতাংশ মানুষও যদি কোনো স্থাপনা ভাঙচুর কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ডে একত্র হয়, তাহলে এত মানুষের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে আইন প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পুলিশের প্রধান দায়িত্ব জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার সক্ষমতার মধ্যে থেকে প্রতিরোধমূলক ও ঘটনাপরবর্তী উভয় ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে। ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
সাতক্ষীরার ঘটনায় ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে জনতা জড়ো করার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক উসকানি শনাক্ত ও প্রতিরোধে পুলিশের সক্ষমতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। এ বিষয়ে সায়েদুর রহমান স্বীকার করেন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের সক্ষমতা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, আইনগত কাঠামো, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের জন্য সময় প্রয়োজন।
বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট, নাকি সামাজিক অসহিষ্ণুতা
মব সহিংসতার পেছনে সামাজিক অস্থিরতা ও মানুষের সহনশীলতা কমে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, মানুষ এখন অনেক ক্ষেত্রে অল্পতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ছে এবং ধৈর্য হারাচ্ছে। রাষ্ট্রের আইন ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থায় পরিবর্তন ঘটছে কি না, সেটিও গবেষণা করে দেখা প্রয়োজন। তবে কোনো একটি কারণকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না।
পুলিশের পক্ষ থেকে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মব সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের সহিংসতা আরও বাড়বে।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা মৌলিক অধিকার। মব সহিংসতার মতো ঘটনা মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য গুরুতর হুমকি। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সরকারের কঠোর আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মব সহিংসতা প্রতিরোধে কেবল ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো কিংবা হামলার পর মামলা করাই যথেষ্ট নয়। অভিযোগের সূত্রপাত, জনতা জড়ো করার প্রক্রিয়া, উসকানিদাতার ভূমিকা, হামলায় নেতৃত্ব এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের সম্ভাব্য পরিকল্পনা—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা, রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
আরও পড়ুন:







