লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভনে তরুণদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় অন্তত ১৮টি চক্রের সন্ধান পেয়েছে সিআইডি। দেশের ১৫ জেলার বেশি এলাকায় বিস্তৃত এসব চক্রের সদস্যদের মধ্যে অনেকে বিদেশে পলাতক।
ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে তরুণদের লিবিয়ায় নিয়ে যায় মানব পাচারকারীরা। পরে তাদের একাংশকে দেশটির বিভিন্ন বন্দিশালা বা গেমরুমে আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। টাকা দিতে না পারলে চালানো হয় মারধর, বৈদ্যুতিক শকসহ নানা ধরনের নির্যাতন। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারান অনেকে। অন্যদিকে, লিবিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি পাচারকারীদের একটি অংশ গড়ে তুলেছে বিপুল সম্পদ।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অন্তত ১৫ জেলায় ১১৯ জনের বেশি মানব পাচারকারীকে চিহ্নিত করেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, তারা লিবিয়া হয়ে ইউরোপে মানব পাচারে জড়িত এবং অন্তত ১৮টি চক্রের সঙ্গে যুক্ত। শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মাদারীপুর ও কিশোরগঞ্জেরই ৪৪ জন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, শনাক্ত ১১৯ জনের সবাই গ্রেপ্তার হননি। তাদের অনেকে বিদেশে পলাতক। আবার লিবিয়া ও ইউরোপে সক্রিয় থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা না থাকায় অন্তত ৪৮ জনকে মামলার চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মাদারীপুর ও কিশোরগঞ্জ ছাড়াও ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল ও বরগুনায় পাচার চক্রের সদস্যদের সন্ধান পেয়েছে সিআইডি। তালিকায় স্থানীয় দালালদের পাশাপাশি লিবিয়ায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের নামও রয়েছে।
মাদারীপুরের আমির শেখ, কিশোরগঞ্জের সজিব ও জাফরসহ কয়েকজনের লিবিয়ায় অবস্থানের তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। গোপালগঞ্জের বশির শিকদার ও সেন্টু শিকদার, নীলফামারীর আবদুল্লাহ ওরফে আসাদুজ্জামান এবং ফরিদপুরের মুন্না মালসহ আরও কয়েকজনের বিদেশে অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে।
সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন জেলার ছোট ছোট গ্রুপ লিবিয়াভিত্তিক চক্রের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে। বাংলাদেশে থাকা সদস্যরা যাত্রী সংগ্রহ, টাকা আদায় ও বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। লিবিয়ায় থাকা সদস্যরা তাদের গ্রহণ করে পরবর্তী গন্তব্যে পাঠানো, আটকে রাখা কিংবা মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
মিজদাহ হত্যাকাণ্ডে সামনে আসে পাচার নেটওয়ার্ক
লিবিয়ায় বাংলাদেশি মানব পাচার চক্রের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২০ সালের ২৮ মে। ওই দিন মিজদাহ শহরে জিম্মি করে রাখা ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করে পাচারকারীরা। এ ঘটনায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ২৫টি মামলা হয়। এসব মামলার তদন্তে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাচারকারীদের নেটওয়ার্কের তথ্য বেরিয়ে আসে। সিআইডি এসব মামলায় চার্জশিটও দিয়েছে।
একটি মামলায় ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ৪১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়। এতে তানজিদ/তানজিমুল/তানজিরুল, জবর আলী, জাফর মিয়া, স্বপন, মিন্টু মিয়া, শাহীন বাবু, আমির হোসেন, নজরুল মোল্লা, কামালউদ্দিন, কামাল হোসেন, জুলহাস সর্দার, দীনা বেগম, শাহাদাত হোসেন, নাজমুল হাসান ও হেলাল মিয়াসহ আরও অনেকের নাম রয়েছে।
মিজদাহ হত্যাকাণ্ডের শিকার কিশোরগঞ্জের যুবক আকাশও একই নেটওয়ার্কের ফাঁদে পড়েছিলেন। তার ভাই নাজির হোসেন তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান, ঢাকার মানব পাচারকারী হাজী কামালের মাধ্যমে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়ে লিবিয়ায় যান আকাশ। পরে তানজিদুল তাকে বেশি বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখান। একপর্যায়ে আকাশকে আটকে রেখে ১২ হাজার ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। তাকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া ও রড দিয়ে মারধরের কথাও পরিবারকে জানানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মুক্তিপণ না পেয়ে আকাশকে হত্যা করা হয়।
লিবিয়ায় অবস্থান করে চক্র পরিচালনার অভিযোগ
সিআইডির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাচারকারীদের একটি অংশ বাংলাদেশে বসে কাজ করলেও চক্রগুলোর মূল নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ থাকে লিবিয়ায়। সেখানে থাকা ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো তরুণদের গ্রহণ করেন। পরে অন্য গন্তব্যে পাঠানোর কথা বলে তাদের আটকে রাখা হয়।
নড়াইলের আলাউদ্দিন শেখকে একটি চক্রের প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিআইডি। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রায় ১২ বছর আগে তিনি লিবিয়ায় যান। গত ১৩ এপ্রিল তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের ৩৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ চক্রের সদস্যরা দেশের ১১ জেলায় ছড়িয়ে আছেন। চক্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে ৩৭৬ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সাতবাড়িয়া বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে টাকির খাল। খালের পাশে রয়েছে আলাউদ্দিন শেখের দোতলা বাড়ি। ইতালি পাঠানোর কথা বলে লোকজনকে লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের সদস্যদের পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ওই অর্থে তিনি বাড়ি, গাড়ি ও খামারসহ বিপুল সম্পদ গড়েছেন বলে জানা গেছে।
এ চক্রের আরেক সদস্য আউয়াল ফরাজী। তার বাড়িও সাতবাড়িয়া গ্রামে। সেখানেও রয়েছে দৃষ্টিনন্দন দোতলা বাড়ি। তার দুই ভাই রাব্বানী ফরাজী ও রুবেল ফরাজীও এ চক্রের সঙ্গে জড়িত।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, লিবিয়ায় বাংলাদেশের তিনটি অঞ্চলের ১০ থেকে ১২টি জেলার মানুষ বেশি গেছেন। ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে লিবিয়ায় জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়ে ২০১৮ সালের পর এ পর্যন্ত ১৫ হাজার মানুষ দেশে ফিরেছেন।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট খুলনার রাব্বানী ফরাজীকে গ্রেপ্তারের পর তার বড় ভাই আউয়াল ফরাজীকে চক্রের হোতা হিসেবে চিহ্নিত করে। রাব্বানীর বিরুদ্ধে লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তার সঙ্গে প্রায় ৩০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্যও পেয়েছে সিআইডি।
তদন্তে কুমিল্লার মানিক ও শরীফ হোসেন, সুনামগঞ্জের আলী হোসেন ও সালেহ আহমদ, মাদারীপুরের নজরুল মোল্লা এবং গোপালগঞ্জের বশির শিকদারসহ আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। সিআইডির তালিকায় দুবাই, ইতালি ও শারজায় অবস্থানকারী ব্যক্তিদের নামও রয়েছে। তাদের মধ্যে আফ্রিন আহমেদ, সোহাগ হোসেন ওরফে দিল্লি সোহাগ, সেলিম ওরফে সাউথ সেলিম, রাজন ওরফে বুলেট, মনির ওরফে সিটি মনির, আবদুল্লাহ আল ফারুক ওরফে বাঁধন, সনাতন দাশ ওরফে দাদা, জসিম, কাজী শরীফ ও ওয়াসিম বাবুসহ আরও অনেকে রয়েছেন।
গ্রেপ্তার অভিযান ও তদন্ত চলছে
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, মানব পাচারকারীদের তালিকা তৈরির কাজ এখনো চলছে। কাজ শেষ হলে দেশে কতজন দালাল এবং লিবিয়ায় কতজন মাফিয়া রয়েছে, তা আরও স্পষ্ট হবে।
এর আগে গত বছরের ২১ আগস্ট সাখাওয়াত হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। সংস্থাটি তখন জানায়, তিনি লিবিয়ায় একটি মাফিয়া সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন এবং ৪০০ থেকে ৫০০ বাংলাদেশিকে নৌকায় করে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এরপর নভেম্বরে খন্দকার রিফাত হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে লিবিয়ায় একজন বাংলাদেশিকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। ডিসেম্বরে মোহাম্মদ নজিরকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তার বিরুদ্ধে গ্রিসে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বাংলাদেশিদের লিবিয়ায় নিয়ে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়।
চলতি বছরের ১৫ জুন মিকাইল ইসলাম এবং ১৭ জুন রাব্বানী ফরাজী গ্রেপ্তার হন। গত সেপ্টেম্বরে রফিকুল ইসলাম ওরফে রফিক বাঘা, আমির হোসেন স্বপন ও আবুল হোসাইনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৫ অক্টোবর সিআইডি আশকোনা থেকে মো. আতিকুর রহমান টমাস ও বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলালকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে মিসর হয়ে বাংলাদেশিদের লিবিয়ায় পাচার করে গেমরুমে আটকে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন:







