বৃহস্পতিবার

১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ৩০ আশ্বিন, ১৪৩৩

স্টান্ট শিখতে গিয়ে আঘাতে জর্জরিত তবুও দমে যাননি ‘বাংলার কৃষ’!

সবুজ এইচ সরকার, সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:০৮

শেয়ার

স্টান্ট শিখতে গিয়ে আঘাতে জর্জরিত তবুও দমে যাননি ‘বাংলার কৃষ’!
ছবি সংগৃহীত

শুধু ভাইরাল হওয়ায় নয়, নিজেকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখেন বাংলার কৃষখ্যাত মামুন। অন্যের মোবাইল ফোনে ভিডিও দেখে স্টান্ট শেখা; নিজস্ব ভুবনে বড় জায়গা গড়ার স্বপ্ন।

একটা ডিগবাজি শেখার শখ থেকেই আজ বাংলাদেশের পরিচিত মুখ তিনি। কঠিন সব স্টান্ট, উঁচু উঁচু ভবন থেকে লাফানো—আর গায়ে বলিউড অভিনেতা হৃতিক রোশনের কৃষ চরিত্রের আদলে তৈরি পোশাক, মুখে কৃষের মাস্ক। দেখলে মনে হয়, যেন খোদ কৃষই বাস্তবে হাজির হয়ে একের পর এক স্টান্ট করে চলেছেন!

মো. আল মামুন। পেশায় একজন এসএস পাইপ ফিটিংস মিস্ত্রি। কাজের পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন স্টান্ট ও কনটেন্ট তৈরির কাজ। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বনবাড়িয়া পাইকপাড়া গ্রামের এই তরুণ কৃষের পোশাক পরে নানা কলাকৌশলে বিভিন্ন স্টান্ট দেখিয়ে ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করেছেন।

সাফল্যের পথে কৃষের পোশাক

জানা যায়, শুরুতে নিজের করা স্টান্টের ভিডিও নিজেই তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করতেন তিনি। কিন্তু, সাধারণ স্টান্টের মতো হওয়ায় আশানুরূপ ফলাফল মেলেনি। পরে ব্যতিক্রমী কিছু করার ভাবনা থেকেই বলিউড অভিনেতা হৃতিক রোশনের কৃষ চরিত্রের পোশাক তৈরির মাধ্যমে আবারও নতুন করে বিভিন্ন স্টান্টের ভিডিও আপলোড শুরু করলে ধীরে ধীরে আসতে থাকে সাফল্য।

একপর্যায়ে নিজের ব্যতিক্রমী সাজ আর শারীরিক কসরত দিয়েই দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়ে যান আল মামুন। হয়ে ওঠেন বাংলার কৃষ। তবে তার এই সাফল্য যতটা মিষ্টি, এর পেছনের গল্পটা ঠিক ততটাই তিক্ত। পরিচিতির আলোয় উঠে আসা এই তরুণের পথচলার আড়ালে রয়েছে অভাব, সীমাবদ্ধতা, শারীরিক যন্ত্রণা আর নানা প্রতিকূলতার গল্প।

আল মামুনের ভাষ্য, কৃষের মতো পোশাক বানানোর সামর্থ্য না থাকায় বড় বোনের পুরোনো বোরকা কেটে-ছেঁটে তৈরি করেছেন সুপারহিরো কৃষের পোশাক।

আঘাত আর প্রতিকূলতার গল্প

শুধু তা-ই নয়, এই পরিচিতি অর্জন করতে গিয়ে তাকে পোহাতে হয়েছে শারীরিক আঘাত। শিকার হতে হয়েছে নানা দুর্ঘটনার, এমনকি গুরুতর অনেক জখমেরও।

সেইসঙ্গে সামনে এসেছে পরিবারের বাধা, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর নানা সমালোচনা।

পরিবারের বাধা, প্রতিবেশীদের সমালোচনা, আর অনুশীলন করতে গিয়ে শরীরজুড়ে অসংখ্য আঘাত—কোনো কিছুই দমিয়ে রাখতে পারেনি তাকে। অদম্য জেদ আর নিরন্তর অনুশীলনে বাংলার এই কৃষ একটি মাত্র স্টান্ট শিখতে গিয়েই ধীরে ধীরে আয়ত্ত করেছেন অসংখ্য স্টান্ট। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলেছেন নিজের স্বপ্নের পথে।

তার আয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, শুরুতে ভিডিও থেকে কোনো আয় না হলেও, এখন মোটামুটি আয় হচ্ছে। সেইসঙ্গে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে কনটেন্ট তৈরির তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন মামুন।

অন্যদিকে, তার বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজনদের কাছ থেকেও জানা যায় বাংলার কৃষ খ্যাত আল মামুনের জীবনের সংগ্রামের গল্প। তাদের বক্তব্য, মামুনের কাছে কোনো মোবাইল ফোন ছিল না। অন্যের ফোন নিয়ে স্টান্টের ভিডিও দেখতেন, আর সেই ভিডিও দেখে নিজে নিজেই অনুশীলন করতেন তিনি।

বড় স্বপ্নের পথে

এদিকে, মামুনের জীবনের গল্পের মতো তার স্বপ্নটাও বেশ বড়। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মুখ হয়ে থাকাই নয়, বরং তার অভিনব সব স্টান্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্টান্ট জগতে নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে চান বলে জানান তিনি।

একটি ডিগবাজি শেখার শখ থেকে শুরু হওয়া পথচলা, বড় বোনের পুরোনো বোরকা দিয়ে কৃষের পোশাক তৈরি, অন্যের ফোনে ভিডিও দেখে অনুশীলন, আর শরীরজুড়ে আঘাত নিয়েও স্বপ্নের পিছু ছোটা—সব মিলিয়ে আল মামুনের গল্প কেবল ব্যতিক্রমী সাজে পরিচিতি পাওয়ার গল্প নয়; এটি সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক নিরন্তর সংগ্রাম।