রবিবার

২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১০ কার্তিক, ১৪৩৩

বরাদ্দের দীর্ঘ সময় পার হলেও চালু হয়নি সাত কোটি টাকার কমিউনিটি সেন্টার

মোঃ আব্দুল হাই,জয়পুরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:০৭

শেয়ার

বরাদ্দের দীর্ঘ সময় পার হলেও চালু হয়নি সাত কোটি টাকার কমিউনিটি সেন্টার
ছবি; বাংলা এডিশন

নির্মাণকাজ শুরু করার পর পেরিয়ে গেছে সাত বছরেরও বেশি সময়। তবু সদর দরজা খোলেনি জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার কমিউনিটি সেন্টারের। তিন বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি কমিউনিটি সেন্টার । দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ ঝুলে থাকায় এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকাবাসী।

কালাই পৌরসভার আওড়া মোড়ের সামনে সিনেমা হল-টু-গঙ্গাদাসপুর সড়কের পাশে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পৌর কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই অর্থবছরের ৭ মার্চে প্রকল্পটি অনুমোদন হওয়ার পর ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল নির্মাণকাজ শুরু হয় বলে জানান পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক মোস্তা হাসান। তবে এই বিষয়ে পৌর প্রকৌশলী এ কে এম সাইফুল ইসলাম এর কাছ থেকে এবিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে তিনি মোস্তা হাসানের কাছ থেকে তথ্য নেয়ার পরামর্শ দেন। পরে মোস্তা হাসান প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্যগুলো সরবরাহ করেন।

তার তথ্যমতে জানা যায়, প্রকল্পটির প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ কোটি ৫৬ লাখ ২০ হাজার ৬০৬ টাকা। পরে ১০ শতাংশ ছাড় দিয়ে টেন্ডার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৩৮৬ টাকা। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ৫ কোটি ৯৮ লাখ ৯ হাজার ৬২০ টাকা এবং পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে ৮১ লাখ ৪০ হাজার ৮৬৬ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। পৌরসভা সূত্রে আরও জানা গেছে, তৎকালীন পৌর মেয়র খন্দকার হানিমুল আলম জনের মেয়াদকালে প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৩৮৬ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির টেন্ডার সম্পন্ন হয়।

প্রকল্পটির মূল ঠিকাদারি কাজ দেয়া হয় মেসার্স কবির ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী একরামুল কবির আহম্মেদের নামে। তবে অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে নির্মাণকাজ করছেন মেসার্স নজরুল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম। কী ধরনের চুক্তি, অনুমোদন বা বৈধ প্রক্রিয়ায় এক প্রতিষ্ঠানের কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে অডিটোরিয়াম নির্মাণের মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কবির ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী একরামুল কবির আহম্মেদ এর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,অডিটোরিয়ামটির নির্মাণ কাজ কালাইয়ের নজরুল ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম করছে । এই সংবাদ প্রকাশের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে তিনি নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে নজরুল ইসলামকেও দেখা করতে বলবেন বলেও জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঠিকাদারি কাজ হস্তান্তর বা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অডিটোরিয়ামটির নির্মাণকাজ নির্ধারিত তিন বছরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও বছরের পর বছর ধরে কাজ চলমান রয়েছে। সাত বছরেও নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

পৌরসভার থুপসারা গ্রামের বাসিন্দা রায়হান বলেন, এই কমিউনিটি সেন্টারের কাজ পাচঁ থেকে সাত বছর হলো শুরু হয়েছে, কাজ ও প্রায় শেষের মধ্যে এখনো কাজ সম্পন্ন হয়নি। এই কাজটা সম্পন্ন হবে কবে? আমাদের সুবিধা হবে কবে? এটা হচ্ছেনা কেন? সমস্যা কি?হয়না কেন? কাজ নিয়ে এতো ভংচং কেন? এমন সব প্রশ্ন ছুড়ে দেন পৌর ও ঠিকাদারি কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

পৌরসভার আওড়া গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, পৌর কমিউনিটি সেন্টারের কাজ গত পাচঁ থেকে সাত বছর ধরে শুধু ই করতেছেই কিন্তু এটা উদ্বোধন হয়না। আমাদের পৌরবাসীর যে একটা আশা আকাঙ্ক্ষা, এটা চালু হলে যে পূর্ণ হবে, সেটা হচ্ছেনা। এটা চালু হলে আমাদের পৌরর বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও মেয়ে-ছেলের বিয়ে শাদির জন্য আমরা যেসব সেবা পেতাম সেট পাচ্ছিনা। আমরা চাই কমিউনিটি সেন্টারটি অতি তাড়াতাড়ি চালু হোক।

কালাই উপজেলা শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক গোলাম আযম ফিতা বলেন, কালাই পৌর অডিটোরিয়ামের কাজ দীর্ঘ ছয় সাত বছর ধরে ধীর গতিতে চলছে, দ্রুতগতিতে এই কাজ সুসম্পন্ন করা উচিত। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিভিন্ন যে অনুষ্ঠানগুলো হয় অনেক সময় ঝড় বৃষ্টির কারণে আমরা খোলা মাঠে সেই অনুষ্ঠানগুলো করতে পারিনা।পৌর অডিটোরিয়াম চালু হলে আমরা সে অডিটোরিয়ামে এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো করতে পারতাম।

নির্মাণাধীন অডিটোরিয়ামটির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নজরুল ট্রেডার্সের কর্মচারী আবুল কালাম বলেন, ‘আমি অডিটোরিয়ামটির দেখাশোনা করি। কাজটি শেষও করতে পারছি না, আবার ছেড়েও দিতে পারছি না। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ কেন কাজটি বুঝে নিচ্ছে না, তা জানি না। আমার ঠিকাদার বলেছেন, টাকা না পাওয়ায় কাজ করতে পারছেন না। তাঁরা অল্প অল্প টাকা দেন, আমরাও অল্প অল্প করে কাজ করি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবী, অর্থ সংকটে বন্ধ ছিল কাজ। সরকারি বরাদ্দের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা এখনও পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে ৮১ লাখ ৪০ হাজার ৮৬৬ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা পরিশোধ করেনি পৌর কতৃপক্ষ। এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বরাদ্ধকৃত টাকার যে ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা ছিল তার মধ্য থেকেও দীর্ঘদিন অর্থ না পাওয়ায় নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল এবং এর আগে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণেও কয়েক মাস নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল যে কারণে নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পারেননি বলে জানান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

নির্মাণকাজ বাস্তবায়নকারী হিসেবে পরিচিত নজরুল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা এ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছি এবং সেই অনুযায়ী কাজও করেছি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাকি টাকা না পাওয়ায় কাজ বন্ধ ছিল। মাননীয় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপির সহযোগিতায় স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বরাদ্দকৃত টাকার মধ্যে ব্যাংকে জমা থাকা অর্থ থেকে আরও ১০ লাখ টাকা পেয়েছি। টাকা পাওয়ার পর অডিটোরিয়ামের বাউন্ডারি ওয়ালের কাজ করছি। বরাদ্দকৃত টাকার মধ্যে এখনো ১কোটি ১০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।

কালাই পৌরসভার প্রকৌশলী এ কে এম সাইফুল ইসলামজানান, নির্মাণকাজ শেষ করার মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটি নির্মাণের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত রয়েছে। পর্যন্ত যে কাজ হয়েছে, তার বিল ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদার চাইলেই তো আমি টাকা দিতে পারি না। তারা পৌরসভার রাজস্ব তহবিল থেকে টাকা দাবি করছেন। কিন্তু আমাদের স্টাফদের বেতন দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। টাকা কোথা থেকে দেব?

তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপি আমাকে ঠিকাদারকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাংকে অবশিষ্ট থাকা টাকা থেকে কিছু অর্থ দিতে বলেন। এরপর ব্যাংকে থাকা অর্থ থেকে তাকে আরও ১০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। পৌরসভা থেকে যে ৮১ লাখ ৪০ হাজার ৮৬৬ টাকা দেয়ার কথা ছিল, তা দিতে না পারায় গত ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিশেষ বরাদ্দের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়, পরবর্তীতে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপির ডিও লেটার সংযুক্ত করে মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে অর্থের জন্য কাজ আটকে থাকবে না। আর বিশেষ বরাদ্দ না পেলেও আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে কমিউনিটি সেন্টার চালু করে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা আশা করতেছি আগামী শীতের আগেই এটা উদ্বোধন করে আমরা যেন কালাই বাসী এর সুফল পেতে শুরু করি।

কালাই পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ বলেন, পৌরসভার অডিটোরিয়ামটির কাজ দীর্ঘদিন ধরে ফান্ড সংক্রান্ত জটিলতার কারণে স্থবির হয়ে আছে। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছি। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয় ডিও লেটার দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ফান্ডসংক্রান্ত জটিলতা খুব দ্রুত নিরসন হবে বলে আমরা আশা করছি। আগামী তিন মাসের মধ্যে এটি চালু করতে পারবো। যদি এর মধ্যে পুরোপুরি কাজ শেষ নাও হয়, তারপরও যেহেতু একটি বড় স্থাপনা ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে, সেটিকে পৌরসভার আয়বর্ধক হিসেবে কাজে লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই কালাই পৌর অডিটোরিয়ামটি চালু করা সম্ভব হবে।

দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ চললেও অডিটোরিয়ামটি এখনও পুরোপুরি চালু না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তারা বলেন ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত কালাই পৌরসভা বিগত সময়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চললে ও ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টে রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের পর থেকে উন্নয়নের নামে কালাই পৌরসভার রাস্তাঘাট ,ব্রিজ, কালভার্ট, ড্রেন নির্মাণ হলেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পৌরসভায় কর্মরত থেকেও ঠিকাদার হয়ে, দিনের কাজ রাতে করার ও ঘটনা আছে এই পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। ফলে সরকারী অর্থ চলে যাচ্ছে অসৎ কর্মকর্তাদের পকেটে। আর পৌরবাসী বঞ্চিত হচ্ছে সেবা থেকে।