একটি কলেজ, অথচ অধ্যক্ষের দায়িত্ব দাবি করছেন তিনজন, সভাপতির পদ নিয়েও রয়েছে একাধিক দাবিদার। কমিটি গঠন, আদালতের আদেশের ব্যাখ্যা এবং নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ—সবকিছু ঘিরেই তৈরি হয়েছে জটিলতা। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার দুর্গাহাটা ডিগ্রি কলেজে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে এমন বিরোধে অনিশ্চয়তা বাড়ছে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রমে। এরই মধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ঘটনায় নতুন করে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
গত ৯ অক্টোবর স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় কলেজটির নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। তবে বিজ্ঞপ্তিটি কে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং এর পেছনে কোন কমিটির অনুমোদন রয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কমিটির বৈধতা নিয়ে বিরোধের মধ্যেই নিয়োগের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে কলেজটির পরিচালনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অধ্যক্ষের দায়িত্বে কে, স্পষ্ট নয়
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন মোজাফফর হোসেন। পরে তিনি পদত্যাগ করলে ময়নুল আহসান দায়িত্বে আসেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর অনুপস্থিতিতে সংসদ সদস্য ও শিক্ষকদের সুপারিশে জিয়াউল ইসলাম জুয়েলকে অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে বর্তমানে কে বৈধভাবে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিয়ে স্পষ্টতা নেই।
তবে কলেজে সরজমিন গিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে জিয়াউল ইসলাম জুয়েলকে। তিনি বলেন ৬ মাস হলো ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন তবে বর্তমান নিয়োগের বিষয়টি তার জানা নেই।
আরেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দাবিদার ময়নুল আহসান। মুঠোফোনে তিনি বলেন, কমিটি নিয়ে জটিলতার কারণে প্রায় ছয় মাস ধরে কলেজে যাচ্ছেন না তিনি।
সভাপতির পদেও একাধিক দাবিদার
অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়ে জটিলতার পাশাপাশি গভর্নিং বডির সভাপতির পদ নিয়েও বিরোধ চলছে। কলেজ সূত্রের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাখাওয়াত হোসেন লিটনকে সভাপতির পদ থেকে বাদ দেয়া হয়। পরে আকিল আহম্মেদ মমিনকে সভাপতি এবং রবিউল আলম অশ্রুকে বিদ্যুৎসাহী সদস্য করা হয়।
পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ সদস্য রবিউল আলম অশ্রুকে সভাপতি এবং আকিল আহম্মেদ মমিনকে বিদ্যুৎসাহী সদস্য হিসেবে মনোনয়নের জন্য বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টন ডিও লেটার দেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে শাহজালাল মানিকও নিজেকে কলেজটির সভাপতি দাবি করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকেও সংসদ সদস্য ডিও লেটার দিয়েছেন। ফলে সভাপতির পদে একাধিক ব্যক্তির দাবি এবং কমিটি পরিবর্তনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলেজ পরিচালনার বৈধতা নিয়ে বিরোধ আরও জটিল হয়েছে।
আদালতের আদেশ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি:
কলেজের কমিটি ও নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে বিরোধ গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। একটি পক্ষের দাবি, শাহজালাল মানিকের নেতৃত্বাধীন কমিটির নিয়োগ কার্যক্রমের ওপর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। তবে আদালতের আদেশের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু, মেয়াদ ও কার্যপরিধি সম্পর্কে প্রত্যয়িত নথি দেখাতে পারিনি কোন পক্ষই।
সভাপতি দাবি করা আকিল আহম্মেদ মমিন বলেন, বর্তমানে কলেজটিতে তিনটি কমিটি নিজেদের বৈধ বলে দাবি করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গঠিত কমিটির বিরুদ্ধে তাঁরা হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। আদালতের রায়ের মাধ্যমে তিনি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
আকিল আহম্মেদ মমিন আরও বলেন, পরে শাহজালাল মানিককে সভাপতি করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজ বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাঁর প্রশ্ন, এ অবস্থায় গত ৯ অক্টোবর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি কার উদ্যোগে এবং কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে প্রকাশিত হয়েছে?
তিনি বলেন, “বর্তমানে যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে, এর বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ করব। পত্রিকায় প্রতিবাদ জানাব এবং প্রতিবাদ সভা করব। এলাকাবাসী, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও কমিটি এ নিয়োগ মেনে নেবে না।” নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পেছনে কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, সভাপতি দাবি করা শাহজালাল মানিকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকের কলেজে প্রবেশের অনুমতি ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সরকারি বিধির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান চলাকালে অনুমতি ছাড়া কোনো সাংবাদিক সেখানে প্রবেশ করতে পারেন না। পরে সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলবেন জানিয়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
বিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ:
কমিটি নিয়ে বিরোধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কলেজটির জমিদাতা ও স্থানীয়রা। জমিদাতা মো. আশরাফ আলী বলেন, কমিটি নিয়ে টানাপোড়েনের কারণে কলেজের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষকদের অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে এবং একের পর এক কমিটি পরিবর্তনের ঘটনায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা চাই, কলেজটি ভালোভাবে চলুক, উন্নত হোক এবং সবদিক থেকে শান্তি ফিরে আসুক। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পড়াশোনার পরিবেশ যেন ঠিক থাকে।”
কলেজের শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিনও কমিটি নিয়ে বিরোধের কারণে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য, বারবার সভাপতি পরিবর্তন এবং আদালতে রিটের ঘটনায় কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, কলেজটিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী অল্প খরচে পড়াশোনা করে। কমিটি নিয়ে বিরোধ ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম এবং শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস প্রশাসনের:
বিষয়টি নিয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, দুর্গাহাটা ডিগ্রি কলেজে একটি কমিটির নিয়োগ কার্যক্রম এবং অন্য পক্ষের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, কলেজটির প্রকৃত অবস্থা জানতে গাবতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবেন। দ্রুত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে।
এডহক কমিটির নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, এ ধরনের কমিটির নিয়োগ দেয়ার আইনগত সুযোগ নেই। এডহক কমিটির মূল কাজ হলো দাপ্তরিক কার্যক্রম চালু রাখা, নির্বাচন সম্পন্ন করা এবং নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা।
তিনি আরও বলেন, সভাপতি ও কমিটি নির্ধারণের এখতিয়ার শিক্ষা বোর্ডের। উপজেলা থেকে পাওয়া প্রস্তাব বোর্ডে পাঠানো হয়। কলেজটির অচলাবস্থার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে তদন্ত করা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করে বিরোধের নিষ্পত্তি করবে। কমিটি ও নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে কলেজে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ফিরবে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
আরও পড়ুন:







