বুধবার

১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ২৯ আশ্বিন, ১৪৩৩

গ্যাসের বাড়তি দামে নিভলো দেশের প্রথম সিরামিক কারখানা 'তাজমা'

আবুল কালাম আজাদ,বগুড়া প্রিতিনিধি

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:২৭

শেয়ার

গ্যাসের বাড়তি দামে নিভলো দেশের প্রথম সিরামিক কারখানা 'তাজমা'
ছবি; সংগৃহীত

বগুড়ার ঐতিহাসিক তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। মূলধন সংকট ও নানা প্রতিকূলতার কারণে দেশের প্রথম এই সিরামিক কারখানাটি বন্ধ হওয়ায় শতাধিক শ্রমিক ও কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন।

গত অক্টোবরে ২২ তারিখে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শরিফুজ্জামান শেয়ার মালিকদের সর্ব সম্মতিক্রমে স্থায়ী বন্ধ ঘোষণা করেন বলে জানিয়েছেন।তিনি বলেন, নানা প্রতিকূলতার মুখে এর আগেও বেশ কয়েকবার বন্ধ করা হয় এ কারখানাটি।

পাঁচ যুগ আগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সিরামিকের মতো কারখানা কীভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানে বসেই কথা হয় শরিফুজ্জামানের সাথে। তিনি শুরুর ইতিহাস তুলে ধরে জানান, তাদের দাদাবাড়ি নওগাঁর রানীনগরে। পাকিস্তান আমলে তার বাবা বগুড়ায় এসে একটি বিড়ি কারখানায় চাকরি করেন। এরপর তিনি নিজেই বিড়ির ব্যবসা শুরু করেন পাকিস্তান আমলে। বিড়ি ব্যবসার মূলধন থেকে সিরামিক কারখানা গড়ার পরিকল্পনা করেন তার বাবা আব্দুল জব্বার। ১৯৫৯ সালে জাপানি প্রতিষ্ঠান নিচিম্যান ট্রেডিং কোম্পানি সহায়তায় তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয়।

আব্দুল জব্বারের চার ভাইয়ের প্রথম অক্ষরের নাম দিয়ে নাজমা নামটি নামকরণ করা হয়। মোহাম্মদ শরিফুজ্জামান ছাড়াও তাজমা সিরামিকে এখন ২জন পরিচালক রয়েছেন।

মোহাম্মদ শরিফুজ্জামান বলেন, ওই সময় জাপানি প্রকৌশলীরা বগুড়ায় অবস্থান করে কোম্পানি পরিচালনা করেন। উৎপাদন প্রক্রিয়াতেও সহায়তা করেন।

তখন বাংলাদেশি শ্রমিক আর জাপানি প্রকৌশলী মিলে ফার্নেস ওয়েল দিয়ে উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু রাখে। কিছুদিনের মধ্যেই বাজারে কারখানার তৈরি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা বাড়ে। তখন শ্রমিক ছিল ৫০ জন।

বন্ধের সময় ২৫০ জনের মতো শ্রমিক ছিলো। অর্ধেকের বেশি নারী। অস্থায়ি দৈনিক মজুরী ভিত্তিক।

কাজ হারা শ্রমিকের মধ্যে একজন বগুড়ার ধুনট উপজেলার ছালেহা বেওয়া। স্বামী মারা যাওয়ার পর ১৩ বছর ধরে এখানে প্রতিদিন ৩০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। এখানে কাজ করেই মেয়ে আকলিমা খাতুনকে বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে অনার্সে পড়াশোনা করাচ্ছিলেন।

তিনি বলেন, আমরা দৈনিক মজুরি হিসেবে কাজ করতাম। কারখনা বন্ধ তাই মজুরীর কথা নাই।

সেফালী খাতুন। প্রায় ১০ বছর আগে এ কারখানায় কাজ শুরু করেন তিনি। স্বামীর দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক নয়, তাই সংসারের পুরো দায়িত্ব এখন তার ওপর। বন্ধ কারখানায় মাঝে মাঝে আসেন তিনি। পরিষ্কার-পরিছন্নতার কিছু কাজ করেন সেফালী খাতুন। কেমন আছেন এ প্রশ্নের জবাবে সেফালী খাতুন বলেন, এক ছেলে আর ৪ মেয়ে সঙ্গে আমরা দুজন বন্ধ কারখানার খণ্ডকালীন একজন নারী শ্রমিক হিসেবে আর কেমন থাকব বুঝতেই পারছেন।

টেকনিশিয়ান আমিনুল ইসলাম। টেকনিক্যাল শাখায় কাজ করছেন ১৯ বছর। তিনি এখনো কারখানায় কর্মরত রয়েছেন। কেন কারখানায় আসেন, অলস পড়ে থাকা মেশিনগুলো পরিষ্কার করতে হয়।’

কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার নানা ধরনের সমস্যার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, যখন মিলটি চালু ছিল তখন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যাগুলো কর্তৃপক্ষ দেখতেন তবে এখনো তারা আগের মতই আমার সমস্যাগুলো দেখেন।

তাজমা সিরামিক কারখানা সূত্রে জানা গেছে, রুপালী ব্যাংকের কাছে কারখানার জমি বন্দক রেখে ৩ কোটি টাকা ঋণ আছে। গ্যাস বাবদ ৪০ লক্ষ টাকা এখনো বকেয়া রয়েছে।

কারখানা বন্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে মোহাম্মদ শরিফুজ্জামান জানান, প্রতিষ্ঠার পর বেশ কয়েক বছর তাজমান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ চলেছে ফার্নেস ওয়েলের ওপর আর তখন প্রতিদিন লাগত ৭ হাজার ৫শ লিটার ফার্নেস ওয়েল আর এ জন্য প্রতিদিন ব্যয় হতো প্রায় ৪৮ হাজার ৭৫৯ টাকা অর্থ্যাৎ মাসে জ্বালানিতে ব্যয় হতো প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা। গ্যাস সংযোগ নেওয়ার পর এ খাতে ব্যয় কিছুটা বেড়ে ১৯ লাখ টাকা হয় কিন্তু তাতে তেমন ক্ষতি হতো না কারণ গ্যাসে পোড়া পণ্যের মান ভালো হওয়ায় চাহিদা ছিল বাজারে। কিন্তু ২০২৩ সালে গ্যাসর দাম বৃদ্ধি হওয়ায় জালানি খাতে ব্যয় ২০ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি মাসে ৪০ লাখ টাকা হলে আর্থিক সংকটে পড়ে তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ আর এ সংকটের মুখে দেড় বছর আগে সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয় কারখানাটি। যে সময় কারখানাটি করা হয় তখন এসব এলাকায় জন মানব শূন্য ছিল। এখন পুরো এলাকাটি জনবহুল এবং আবাসিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। তাই পরিবেশ অধিদপ্তর থেকেও একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে পরবর্তী সময়ের পরিবেশ ছাড়পত্র দিবেন না তারা। তাই কয়েক দিন আগে স্থায়ী সাট ডাউনকরা হয়েছে।

নতুনভাবে এ কারখানাটি চালু করতে কী প্রয়োজন এ প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ শরিফুজ্জামান বলেন, প্রথমেই স্থানান্তরিত করতে হবে। কারণ জনবহুল এলাকায় কারখানার পরিবেশ ছাড়পত্র দিবেন না পরিবেশ অধিদপ্তর। কারখানাটি তারপর প্রয়োজন নিরবচ্ছিন গ্যাস আর সঙ্গে ১০ কোটি টাকা মূলধন। আর নতুন যন্ত্রপাতি দিয়ে উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হলে পণ্যের মান যেমন ভালো হবে তেমন প্রতিযোগিতায় টিকতে তেমন কষ্ট হবে না কারণ বগুড়ায় শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলক কম।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এম.এস.এম আতিকুর রহমান (বাদল সরকার) বলেন, বতর্মানে দেশে সিরামিক শিল্পের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। বগুড়ায় ৮ টি সিরামিক কারখানা আছে। হাজার কোট টাকার বাজার। ঠিক তখন, দেশে প্রথম পথ দেখানো সিরামিক কারখানা বন্ধ করে দিতে হোল ব্যাংকের খামখেয়ালির জন্য।