রবিবার

২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১০ কার্তিক, ১৪৩৩

মহেশপুরে শীতের আগাম আমেজ, খেজুরের রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা

ইসমাইল খান ইয়ানবী,মহেশপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৪৮

শেয়ার

মহেশপুরে শীতের আগাম আমেজ, খেজুরের রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা
ছবি; বাংলা এডিশন

শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে ঝিনাইদহের মহেশপুরে শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্য খেজুরের রস ও গুড়কে ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে মাঠে দেখা যাচ্ছে খেজুর গাছ পরিচর্যা ও কাটার দৃশ্য। গাছিদের ব্যস্ততা জানান দিচ্ছে, আর কিছুদিন পরই শীতের সকালে মিলবে তাজা খেজুরের রস, তৈরি হবে সুস্বাদু গুড় ও পাটালি।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গাছিরা দল বেঁধে দা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে খেজুর গাছ পরিচর্যার কাজে নেমেছেন। কেউ গাছের মাথা চাঁচছেন, কেউ রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলছেন গাছের কাটা অংশ। আবার কোথাও প্রস্তুত করা হচ্ছে রস নামানোর বাঁশের নল ও মাটির হাঁড়ি। সব মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদে বইতে শুরু করেছে শীতের আগাম আমেজ।

গাছিরা জানান, খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য প্রথমে নির্দিষ্ট অংশ পরিষ্কার করে চাঁচ দেওয়া হয়। এরপর কয়েক দিন বিরতি দিয়ে গাছটি রস সংগ্রহের উপযোগী করা হয়। উপযুক্ত সময়ে গাছে বাঁশের নল ও হাঁড়ি বসানো হলে রাতভর ঝরতে থাকে মিষ্টি রস। ভোরে সেই রস সংগ্রহ করে তৈরি করা হয় গুড় ও পাটালি।

তবে সময়ের সঙ্গে খেজুর গাছ ও দক্ষ গাছির সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেকে এ পেশায় আগ্রহী না হওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এ পেশা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবু শীত মৌসুমকে সামনে রেখে পুরোনো গাছিরা আবারও ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন রস সংগ্রহের প্রস্তুতিতে।

মহেশপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইয়াসমিন সুলতানা জানান, খেজুর গাছ সংরক্ষণ ও নতুন গাছি তৈরিতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মানুষকে নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে খেজুর গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ঐতিহ্যবাহী এ পেশার সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহেশপুর উপজেলায় বর্তমানে ১০ হাজার ৫৮৩টি খেজুর গাছ ও ১ হাজার ১২৩ জন গাছি রয়েছেন। শীতের মৌসুম শুরু হলে এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় ও পাটালি তৈরি করা হবে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও সরবরাহ করা হয়।

স্থানীয় গাছি মতিয়ার রহমান বলেন, “আমরা বছরের এই সময়টার অপেক্ষায় থাকি। খেজুরের রস শুধু আমাদের জীবিকার উপায় নয়, এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য।”

খেজুরের রস ও গুড়কে ঘিরে শীতকালে গ্রামবাংলায় তৈরি হয় এক বিশেষ আবহ। ভোরের কুয়াশা, গাছ থেকে হাঁড়ি নামানোর দৃশ্য, বাড়ির উঠানে গুড় তৈরির আয়োজন—সব মিলিয়ে খেজুর গাছকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে কাঁচা খেজুরের রস বাদুড়সহ বিভিন্ন প্রাণীর মাধ্যমে জীবাণু দ্বারা দূষিত হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে রস সংগ্রহের হাঁড়ি পরিষ্কার রাখা, গাছে রস সংগ্রহের স্থান জাল দিয়ে সুরক্ষিত করা এবং কাঁচা রসের পরিবর্তে ভালোভাবে ফুটিয়ে পান করার বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

খেজুর গাছ সংরক্ষণ, গাছিদের উৎসাহিত করা এবং নিরাপদ উপায়ে রস ও গুড় উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে বাংলার এই ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের কাছেও বেঁচে থাকবে। শীতের সকালে খেজুরের রসের মিষ্টি স্বাদ ধরে রাখার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই উদ্যোগ।