টিকটকার থেকে ‘ভাইরাল’ কবিরাজ চিকিৎসা নেয় সরকারি কর্মকর্তারাও! ‘বোবা’ও ডাকছেন আল্লাহ’কে’; অভিনব কায়দায় ‘কারসাজি’ ভাইরাল কবিরাজের ভাইরাল কবিরাজের ‘কারসাজি’ মানিকগঞ্জের জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে কবিরাজি চিকিৎসার নামে প্রতারণার অভিযোগ
ঝাড়ফুঁক, তেল-পানি পড়া আর তাতেই নাকি সেরে যাচ্ছে প্যারালাইসিস, বোবা কিংবা বধিরতার মতো জটিল ব্যাধি।
স্বপ্নে পাওয়া বিশেষ পদ্ধতির দোহাই দিয়ে এমনই দাবি করছেন ‘ব্লগার দুই’ ফেসবুক পেজের আলোচিত মুখ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল কবিরাজ’ নামে পরিচিত মানিকগঞ্জের জয়নাল আবেদীন।
আধুনিক চিকিৎসায় কাজ না হওয়া রোগীরাও তার ফুঁ ও তেল-পানি পড়ায় সুস্থ হচ্ছে, এমন চটকদার ভিডিও দেখিয়ে প্রচার করা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য পেয়েছে বাংলা এডিশনের প্রতিনিধি দল। ওই কবিরাজের এসব নাটকীয় ভিডিও ও দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খোদ রোগীরাই।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে গাজীপুর ও মানিকগঞ্জের দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং শত শত মানুষের হয়রানির ভয়াবহ চিত্র।
কালিয়াকৈরে চিকিৎসার আসর
ঘটনার সূত্রপাত গাজীপুরের কালিয়াকৈরে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে কালিয়াকৈর পৌরসভা হলরুমে বসে জয়নাল আবেদীনের চিকিৎসার আসর। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা হাজারো মানুষের ভিড়ে থমকে যায় পুরো এলাকা। দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে, হুইলচেয়ারে কিংবা স্বজনের কাঁধে ভর দিয়ে রোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে।
শুধু পৌরসভা হলরুমই নয়, সম্প্রতি কালিয়াকৈর থানা প্রাঙ্গণ ও মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানার ভেতরেও তাকে চিকিৎসার আসর বসাতে দেখা গেছে।
আর জয়নালের দাবি, তার কাছে চিকিৎসা নিচ্ছে ডাক্তার, সরকারি কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য সচিব এমনকি পুলিশ কর্মকর্তারাও। সিংগাইর থানার তৎকালীন পরিদর্শক তদন্ত মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাকও তার কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা যায়।
তবে, এ বিষয়ে প্রশাসনিক অবস্থান পরিষ্কার করে মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানার রেজাউল জানান, আব্দুর রাজ্জাক সাধারণ মানুষ হিসেবে যা বলেছেন, কিন্তু প্রশাসনিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে তা করা ঠিক হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে, আব্দুর রাজ্জাক দিয়েছেন ভিন্ন তথ্য। তার দাবি, এ ধরনের চিকিৎসার কোনো ভিত্তি নেই। তবে, একপর্যায়ে সেসময়ে হুট করে তার বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাসস্থান ও প্রতারণার অভিযোগ
এদিকে, মানিকগঞ্জের সিংগাইরের কলেজ রোডের একটি, বহুতল ভবনের ৬ তলায় ভাড়া থাকেন জয়নাল আবেদীন। গাজীপুরে আসর বসলেও মানিকগঞ্জের এই ভাড়া বাসার সামনে এসে দূর-দূরান্তের সাধারণ মানুষ তথাকথিত সেই চিকিৎসার দেখা পাচ্ছেন না। বাসার ভেতরে কাউকেই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এমনকি সংবাদকর্মীরা তার বক্তব্য নিতে গেলে অজ্ঞাত কারণে তিনি বাসায় থেকেও দেখা করেননি।
অভিযোগ রয়েছে, জয়নাল আবেদীন তার পরিচিত কিছু ইউটিউবার ও মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টারদের দিয়ে শুধু নিজের স্বপক্ষে এসব ভিডিও তৈরি করান। অনুসন্ধানে জানা যায়, একসময় তিনি কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইউটিউবার হিসেবে কাজ করতেন এবং ভাইরাল হওয়ার জন্য টিকটকের ট্রেন্ড ফলো করতেন, যিনি এখন অলৌকিক কবিরাজ সেজে বসেছেন।
ভিডিওতে ফুঁ ও পানি পড়ায় তাৎক্ষণিক সুস্থতার যে দাবি করা হয়, ভুক্তভোগীদের মতে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সাজানো। তাদের অভিযোগ, মনগড়া ভিডিও বানিয়ে সাধারণ মানুষ ও অসহায় রোগীদের সাথে নিয়মিত প্রতারণা করছেন ওই কবিরাজ।
আর, বোবা রোগীদের ক্ষেত্রে মুখের ইশারায় ‘আল্লাহ’ বা আম্মা-আব্বা বলানোর মতো অতি সাধারণ বিষয়কে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিয়ে বড় ধরনের প্রতারণা করা হচ্ছে। বাস্তবে মুখের ইশারায় এমন শব্দ যেকোনো বাকপ্রতিবন্ধী মানুষই করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞ মত রয়েছে।
এ নিয়ে, আরও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের চরম ভোগান্তি ও ক্ষোভের কথা।
জানা গেছে, জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে অপচিকিৎসা নিয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি অভিযোগ জমা পড়েনি, তবে তার চিকিৎসা পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার চটকদার প্রচারণার আসল সত্য নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ভিডিও বা চটকদার দাবির ওপর ভিত্তি করে বিভ্রান্ত না হয়ে—যেকোনো শারীরিক অসুস্থতায় নিবন্ধিত ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে সচেতন মহল।
আরও পড়ুন:







