দ্বিতীয় পর্ব: একটি সরকারি হাসপাতালের অনিয়মের অভিযোগ কেবল আর্থিক হিসাবের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রোগীর অধিকার, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং চিকিৎসাসেবার জবাবদিহি। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ডা. হেলেনা আক্তার নিপার দায়িত্ব পালনকালে অন্তত চার কোটি টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভুয়া ক্রয় ভাউচারের মাধ্যমে এই অনিয়ম করা হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় ডা. আবু হেনা মোহাম্মদ জামাল শুভ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পারসোনেল-৪ শাখায় সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর সহযোগিতায় ডা. হেলেনা আক্তার নিপাকে জবাবদিহির মুখোমুখি করার পরিবর্তে ঝিনাইদহের মহেশপুরে বদলি করা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এই অভিযোগ সত্য হলে তা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও জবাবদিহি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তবে বদলির আদেশ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তের ফল যাচাই করেই প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব।
সরকারি অর্থের অনিয়মের অভিযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? কোনো তদন্ত হয়েছিল কি না, হলে তার ফল কী, সরকারি অর্থের ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছিল কি না এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন। শুধু বদলি কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি নয়; অনিয়মের প্রমাণ মিললে যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করাই প্রশাসনের দায়িত্ব।
এদিকে ২০২৬ সালে ডা. রুনাকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়েই তাঁকে ওই পদে বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে এই পদায়নের ফলে কেয়ার সোনো ক্লিনিককে ঘিরে বিদ্যমান অভিযোগের প্রেক্ষাপটে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে পদায়নের বৈধতা, জ্যেষ্ঠতার ক্রম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন, কর্মকর্তাদের চাকরির নথি ও স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
সরকারি চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বিষয়েও বিধি-নিষেধ ও সরকারি নির্দেশনার প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে বেসরকারি চেম্বার বা ক্লিনিকে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা না করার নির্দেশনা উপেক্ষা করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার সুনির্দিষ্ট ভাষা, প্রযোজ্যতা এবং ডা. শুভর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রমাণ যাচাই করা জরুরি।
এ ছাড়া প্রশিক্ষণ ছাড়াই অস্ত্রোপচার করার অভিযোগও সামনে এসেছে। এ ধরনের অভিযোগ চিকিৎসাসেবার মান ও রোগীর নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ, অস্ত্রোপচারের নথি, হাসপাতালের অনুমোদন এবং রোগীর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রটোকল যাচাই ছাড়া অভিযোগটির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। এখানে সরকারি পদ, প্রশাসনিক যোগাযোগ কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সম্পর্কের চেয়ে রোগীর নিরাপত্তা ও সেবার মান অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি অচল থাকার অভিযোগ, রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর অভিযোগ, সরকারি অর্থের অনিয়ম এবং পদায়ন ঘিরে প্রশ্ন—সবকিছু আলাদাভাবে ও সমন্বিতভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট ডা. শুভকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে বলে তথ্য দেয়া হয়েছে। তবে এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আদেশ বা সরকারি বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যায় না।
এখন প্রয়োজন অভিযোগের ভিত্তিতে কার্যকর তদন্ত। দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্রয়সংক্রান্ত নথি ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ, জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা যাচাই, রোগী রেফার করার অভিযোগ অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেয়া হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
কারণ, সরকারি হাসপাতালের দুর্বলতা যদি কোনো অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে থাকে, তবে তার দায় নির্ধারণ করতে হবে। আর অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে সেটিও তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার। জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে নীরবতা নয়—প্রয়োজন স্বচ্ছতা, তদন্ত ও জবাবদিহি।
আরও পড়ুন:







