মঙ্গলবার

১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২৮ আশ্বিন, ১৪৩৩

সৌদিগামী ৫১ ফ্লাইট বাতিল, অনিশ্চয়তায় সাড়ে পাঁচ হাজার কর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:০৫

শেয়ার

সৌদিগামী ৫১ ফ্লাইট বাতিল, অনিশ্চয়তায় সাড়ে পাঁচ হাজার কর্মী
ছবি সংগৃহীত

সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে যাতায়াতের ফ্লাইট সূচিতে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সৌদিগামী ৫১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে দেশে আটকে পড়েছেন ৫ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী। তাঁদের মধ্যে অনেক প্রবাসী কর্মী নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারায় চাকরি ও ভিসার মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রিয়াদগামী সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও ২১ অক্টোবর পর্যন্ত তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রীদের সৌদি আরবে পাঠানোর চেষ্টা করছে সরকার।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় সীমিত পরিসরে ফ্লাইট পরিচালনার কারণে ১২টি সরাসরি ও ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

বাতিল হওয়া সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চারটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুটি, সাউদিয়া এয়ারলাইনসের তিনটি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের তিনটি রয়েছে। অন্যদিকে ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ১৬টি, সালাম এয়ারের তিনটি, ইজিপ্ট এয়ারের একটি, এমিরেটস এয়ারলাইনসের নয়টি, কাতার এয়ারওয়েজের পাঁচটি এবং ফ্লাই দুবাইয়ের পাঁচটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ঢাকা থেকে রিয়াদগামী তাদের সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। ইউএস-বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাঁদের ফ্লাইট ২১ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।

বেবিচকের তথ্যমতে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রমে বিধিনিষেধের প্রভাব সরাসরি ফ্লাইটের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের ট্রানজিট ফ্লাইটেও পড়েছে। রিয়াদগামী ফ্লাইটগুলো অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অথবা বাতিল করা হচ্ছে। ফলে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বিমানবন্দরে প্রবাসীদের ভোগান্তি

গতকাল দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে রিয়াদগামী ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অনেক যাত্রী জানেন না, কবে আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ পাবেন কিংবা টিকিটের তারিখ পরিবর্তনের জন্য কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

বিকল্প যাত্রার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় তাঁদের অনেকে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারার আশঙ্কার পাশাপাশি নতুন করে যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার খরচ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সৌদিপ্রবাসী রফিকুল ইসলামের গতকাল দুপুরে ছুটি শেষে রিয়াদে ফেরার কথা ছিল। আগে থেকেই টিকিট কেটে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। পরবর্তী ফ্লাইট কখন ছাড়বে, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য পাননি তিনি।

রফিকুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তিনি বিপাকে পড়েছেন। যেকোনো মূল্যে তাঁকে সৌদি আরবে ফিরতে হবে। সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। পরবর্তী ফ্লাইটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হলে তাঁর ভোগান্তি কিছুটা কমত।

রফিকুলের মতো অনেক প্রবাসী কর্মীই নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরি, ভিসার মেয়াদ ও নিয়োগকর্তার শর্ত নিয়ে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা করছেন।

বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রী পাঠানোর উদ্যোগ

জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রী পাঠানোর চেষ্টা করছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এয়ার অপারেটরদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থায় যাত্রীদের দাম্মাম ও মদিনা বিমানবন্দরে পাঠানো হবে।

তিনি আরও বলেন, রিয়াদগামী ফ্লাইট শুধু বাংলাদেশ থেকে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকেই বন্ধ রয়েছে। যাত্রীদের হয়রানি বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, দাম্মাম ও মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের সমন্বয় করার চেষ্টা চলছে। যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের বিকল্প ফ্লাইটে মদিনা অথবা দাম্মামে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে তাঁরা সেখান থেকে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন এবং ভিসার মেয়াদ নষ্ট না হয়।

তিনি বলেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করায় যাত্রী পরিবহনে সমন্বয় করা হচ্ছে।

সৌদিপ্রবাসীদের সতর্ক থাকার আহ্বান দূতাবাসের

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্ক থাকার এবং স্থানীয় আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস।

গতকাল প্রকাশিত জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সৌদি কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ ও প্রতিপালনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল স্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দূতাবাস জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্য, ছবি বা ভিডিও ধারণ, আদানপ্রদান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা সৌদি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ কারণে ফেসবুক, ইউটিউব, এক্সসহ কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের ছবি, ভিডিও বা স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এসব তথ্য মুঠোফোনে সংরক্ষণ কিংবা অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে কয়েকটি হটলাইন নম্বর দেওয়া হয়েছে। শ্রমসংক্রান্ত টোল ফ্রি নম্বর ৮০০১০০০১২৫, পাসপোর্টসংক্রান্ত টোল ফ্রি নম্বর ৮০০১০০০১২৬, ডিপ্লোম্যাটিক উইংয়ের নম্বর ৮০০১০০০১২৪ এবং মৃত্যুসংক্রান্ত হটলাইন +৯৬৬৫৭০২১২১৮০।

আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা

হুতিদের হামলার পর সৌদি আরবে ৫ শতাধিক বাংলাদেশি আটকে পড়েছেন। তাঁদের দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং।

গতকাল রাতে পাঠানো সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার পর রিয়াদ বিমানবন্দরে ৫ শতাধিক বাংলাদেশি আটকে পড়েন। তাঁদের মধ্যে ১৭ জনকে ম্যারিয়ট হোটেল, ২৫ জনকে রেডিসন ব্লু এবং ৪০ জনকে রিয়াদের প্রিন্সেস নুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সৌদিয়া এয়ারলাইনসের বাতিল হওয়া এসভি৮০৪ ফ্লাইটের প্রায় ৪০০ যাত্রীকে সৌদি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে বাংলাদেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া পাসপোর্ট হারানো তিন বাংলাদেশির জন্য জরুরি ভ্রমণ অনুমতিপত্র ইস্যু করেছে দূতাবাস।

হামলায় আহত ২৭ বাংলাদেশি, পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর

দূতাবাসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শনিবারের হামলায় আহত বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে ২৭ জনে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জন সৌদিপ্রবাসী কর্মী এবং ১৬ জন ওমরাহ যাত্রী।

আহতদের মধ্যে ১২ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর।

গুরুতর আহতদের একজন নওগাঁর সাফফাত রহমান। তিনি রিয়াদ ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। হামলায় তাঁর ডান পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং মুখমণ্ডল ঝলসে গেছে বলে দূতাবাসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।