সোমবার

১২ অক্টোবর, ২০২৬ ২৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

তাজমিন হত্যাকাণ্ডে সিএনজিচালক একাই জড়িত?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:২৬

শেয়ার

তাজমিন হত্যাকাণ্ডে সিএনজিচালক একাই জড়িত?
ছবি সংগৃহীত

১৫ বছর বয়সী কিশোরী জান্নাতুল তাজমিন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) কুমিল্লার লালমাইয়ের ধানক্ষেতে যার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা চাঞ্চল্য। কিন্তু কীভাবে, কোথা থেকে, কখন এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত? কী ঘটেছিল তাজমিনের জীবনের শেষ দিনটিতে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনুসন্ধানে নামে টিম বাংলা এডিশন।

ঘটনার সূত্রপাত

জানা যায়, ঘটনার শুরু (৪ অক্টোবর)। নিজের একটি হাতঘড়ি বান্ধবীকে দেয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় কিশোরী তাজমিন। প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার এক বান্ধবীর বাসায় আশ্রয় নেন তিনি। এরপর ইনস্টাগ্রামে প্রায় পাঁচ মাস আগে পরিচয় হওয়া রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ হলে রাজু, অনলাইন ব্যাংকিং এর মাধ্যমে তাজমিনকে ৫০০ টাকা পাঠান। আর এর পরপরই কক্সবাজারের উদ্দেশে তাজমিন রওনা হন, বলে জানা যায় তার রাজুর কাছ থেকে।

কক্সবাজারে অবস্থান

তথ্য বলছে, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার কুটুমবাড়ি সড়কের একটি আবাসিক হোটেলে ওঠে তাজমিন ও রাজু। হোটেল ম্যানেজার মো. খোকনের তথ্য অনুযায়ী, নিজেদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে হোটেলের ৩০২ নম্বর কক্ষে একসঙ্গে সময় কাটায় তারা। তবে, হোটেলের রেজিস্টারে তাজমিনের নাম পাওয়া যায় তানজু আক্তার হিসেবে। এমনকি মাত্র ১৫ বছর বয়সী এই কিশোরীর বয়সও রেজিস্টারে ১৮ বছর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ, হোটেলে ওঠার সময় তার পরিচয় ও বয়স—দুটিই ভিন্নভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল।

পরবর্তীতে বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুরে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে ফেরার জন্য তাজমিনকে ‘আইকনিক’ বাসে তুলে দেয় রাজু। অন্যদিকে, কক্সবাজার প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির পরিচালক আবদুল্লাহর বক্তব্য থেকেও উঠে আসে একই ঘটনার সূত্র। আবদুল্লাহ জানান, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত আটটার পর তাজমিন ও রাজু তাঁদের কাউন্টারে আসে। পরদিন, বুধবার (৭ অক্টোবর) কুমিল্লায় যেতে তাজমিনের জন্য ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ পরিবহনের একটি টিকিট কাটেন রাজু।

সিএনজি চালকের সঙ্গে যাত্রা

জানা যায়, কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার পর পদুয়ার বাজার থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন তাজমিন। সিএনজিতে থাকাকালেই রাজুর সঙ্গে ফোনে কথা হতে থাকে তার। এমনকি, কথোপকথনের একপর্যায়ে সিএনজি চালকের কথাও জানতে পারেন রাজু। এ সময় রাজু তাজমিনকে সিএনজি থেকে নেমে যেতে বললে, ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে জানান রাজু। এরপর একাধিকবার তাজমিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও, আর তা পারেননি তিনি।

কিন্তু, এরপরই ঘটনাপ্রবাহে তৈরি হয় রহস্যের জাল। রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) কুমিল্লার লালমাইয়ের একটি ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ।

সুমনের গ্রেপ্তার

তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলের কাছ থেকে পাওয়া পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশার সূত্র ধরেই তদন্তে নামে পুলিশ। জানা যায়, গাড়িটির মালিককে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্ত করা হয় চালক মো. সুমন মিয়াকে। পরে, শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, তাজমিনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর তার ব্যবহৃত আইফোন নিয়ে পালিয়ে যান সুমন।

এদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাজমিন তার বান্ধবীর বাসায় আশ্রয় নিয়েছিল—এমন তথ্যের বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানতে পেরেছেন। এ বিষয়ে তার কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।

রাজুর গ্রেপ্তার

এ ছাড়া, তাজমিন হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অংশ হিসেবে তার প্রেমিক কিংবা পরিচিত রাজুকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রবিবার (১১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

স্থানীয়দের সন্দেহ

কিন্তু, প্রশ্নের এক কঠিন বাস্তবতা যেন লুকিয়ে আছে এখানেই। তথ্যমতে, তাজমিনকে হত্যার পর ঘটনাস্থলে নিজের সিএনজিচালিত অটোরিকশা রেখেই পালিয়ে যান অভিযুক্ত চালক। আর এই সূত্র ধরেই তাঁর কাছে পৌঁছায় পুলিশ। কিন্তু চালক সুমনই যদি হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হয়ে থাকেন, তাহলে হত্যার পর ঘটনাস্থলে নিজের সিএনজি ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়ার মতো, এমন একটি বোকামি কেন করলেন তিনি? আর যদি তিনি, একাই হত্যাকারী না হয়ে থাকেন, তাহলে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আসল মাস্টারমাইন্ড কে বা কারা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সরেজমিনে লালমাইয়ে উপস্থিত হয় বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী দল।

ঘটনাস্থলে সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডে শুধু একজন নয়, প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকতে পারে আরও দুই থেকে তিনজন। সেইসঙ্গে, স্থানীয়দের বর্ণনায় উঠে আসে তাজমিনকে হত্যার লোমহর্ষক বিবরণ।

অপরদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের মতো তাজমিনের ব্যক্তিগত জীবন ঘিরেও রয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। নিহত তাজমিন কুমিল্লা ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। তার আসল বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে। তবে, বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লায় বসবাস করতেন তিনি। স্কুল সূত্রে জানা যায়, বছরের প্রথম দুই মাস ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও, পরবর্তী সাত-আট মাস স্কুলে তার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

একইভাবে তাজমিনের সহপাঠিরাও জানায়, তাজমিন নিয়মিত ক্লাসে আসতেন না। তবে, শিক্ষার্থীর এই করুণ মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করেছেন তাজমিনের শিক্ষক। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, তাজমিনের চলাফেরা নিয়েও তার এলাকায় সমালোচনা রয়েছে। স্থানীয় এক নারীর বক্তব্য থেকেও উঠে আসে, তাজমিনের জীবনযাপনের নানা নেতিবাচক প্রসঙ্গ।

এ বিষয়ে, তাজমিনের পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। জানা গেছে তাজমিনের বাবা-মা বর্তমানে যশোরে অবস্থান করছে।

১৫ বছর বয়সী কিশোরীর এমন পরিণতির জন্য কি শুধু সে-ই দায়ী, নাকি প্রশ্ন রয়েছে বাবা-মায়ের ভূমিকা নিয়েও? পরিচয় যাচাই ছাড়া হোটেলে তরুণ-তরুণীদের থাকার সুযোগ দেয়া নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। বিশ্লেষকদের মতে, অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি দায়িত্বহীন হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। সেইসাথে, সবচেয়ে জরুরি সুযোগ ব্যবহার করে যারা তাজমিনের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে, তাকে দুনিয়া ছাড়া করেছে, তাদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।