ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নতুন সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জেলার নাসিরনগর উপজেলায় সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে, বোনজামাই ও ভাগ্নের স্ত্রীর নামে সারের ডিলারশিপ বরাদ্দ পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয়রা।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) নতুন সার ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ স্বজনেরা কীভাবে ডিলারশিপ পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নে সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে আদনান সাদী "মেসার্স আলীয়াহ ট্রেডার্স" নামে সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন। নাসিরনগর সদর ইউনিয়নে তাঁর বোনজামাই আরক মিয়া "মেসার্স আয়ান ট্রেডার্স" এবং গোয়ালনগর ইউনিয়নে তাঁর ভাগ্নে শরীফের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার স্বর্ণা "এস এস ট্রেডার্স" নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন।
একই সংসদ সদস্যের পরিবারের তিন সদস্যের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও নিয়োগপ্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ১০১টি ইউনিয়ন ও পাঁচটি পৌরসভায় মোট ১০৬টি সারের ডিলারশিপের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৮২৫ জন। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ২৯২ জনের নাম সুপারিশ করে সার ডিলার-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হয়।
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রতিটি ইউনিয়নের ডিলার নিয়োগের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিনজনের নাম সুপারিশ করে। তবে এই সুপারিশ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং তালিকায় অগ্রাধিকার পেতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বরে সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পরে আবেদনগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠানো হয়। যাচাই শেষে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য তিনজনের নাম সুপারিশ করা হয়।
তবে সুপারিশ করা তালিকায় প্রথম অবস্থানে নাম রাখতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোস্তফা এমরান বলেন, উপজেলা থেকে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য যেসব নাম পাঠানো হয়েছে, সেগুলোই সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে দু-একটি ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।
ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি নিজে এ ধরনের কোনো লেনদেন করেননি। অন্য কেউ এমন লেনদেন করেছেন, এমন অভিযোগও তাঁর জানা নেই। তবে উপজেলা পর্যায়ে তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর জেলা প্রশাসকের কাছে কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নান এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক আবু সাঈদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁদের কেউই ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সারের ডিলার নিয়োগ কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ এবং কৃষি উপকরণের সুষ্ঠু বণ্টনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি উত্থাপিত অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে ডিলার নিয়োগ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
আরও পড়ুন:







