সুনামগঞ্জের যাদুকাটা, ধোপাজান ও মরাচেলা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে একটি চক্র নদীর বুক ও তীর কেটে বালু তুলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযানে শ্রমিকেরা আটক হলেও নেপথ্যের হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন।
বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছেন এলাকাবাসী। সর্বশেষ ৪ অক্টোবর দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মরাচেলা নদীর কাজিরগাঁও এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন তাঁরা। এর দুই দিন পর, ৬ অক্টোবর নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৫ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় দিনে মরাচেলা নদী থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের ২৫ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হয়েছে। এর আগে ধোপাজান ও যাদুকাটা নদীর পাড় কেটে শত শত কোটি টাকার বালু উত্তোলনের অভিযোগেও মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলার পরও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি।
বাধা দিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না নদীর পাড় কাটা
সম্প্রতি দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তঘেঁষা মরাচেলা নদীর পূর্ব সোনাপুর অংশে নদীর পাড় কেটে নৌকায় বালু তুলতে দেখা যায়। নিজেদের সীমানায় পাড় কাটা ঠেকাতে কয়েকজন বাধা দিলেও তা মানছেন না বালু উত্তোলনকারীরা।
নদীর পাড়ে নিজের জমি পাহারা দিচ্ছিলেন পূর্ব সোনাপুর গ্রামের আমির হামজা। বালু উত্তোলন বন্ধ করতে শ্রমিকদের একাধিকবার নিষেধ করতেও দেখা যায় তাঁকে।
আমির হামজার অভিযোগ, গ্রামের ছিদ্দিক মিয়া ও তাঁর ভাই-ভাতিজারা বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁদের সঙ্গে বাইরের আরও ২০ থেকে ৩০ জন রয়েছেন। বাধা দেওয়ায় তাঁকে ও তাঁর ভাইকে মারধর করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
একই গ্রামের বালুশ্রমিক আসগর আলী অভিযোগ করেন, ছিদ্দিক, হামিদ, কাদির, মুরছালিন ও আব্দুর রহমান জোর করে আমির হামজাদের জমি দখল করছেন। বাধা দেওয়ায় দুই ভাইকে মারধর করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আসগর আলী বলেন, ছাতক, কোম্পানীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। বালু তোলা বন্ধ না হলে তাঁদের বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি জানান, কয়েক দিন আগে এলাকাবাসীর মানববন্ধনের মুখে শ্রমিকেরা নৌকা নিয়ে নদী থেকে চলে যান। পরদিন আবার নদীর পাড় কাটা শুরু করেন তাঁরা। প্রতিবাদকারীদের হামলা ও মামলায় হয়রানি করার অভিযোগও করেন আসগর আলী।
ইজারা স্থগিত থাকলেও যাদুকাটায় বালু উত্তোলন
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জেলার বৃহৎ বালুমহাল যাদুকাটা নদীতে ব্যাপকভাবে বালু উত্তোলন শুরু করে একটি চক্র। এ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ছয় মাসের জন্য খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয় জেলা প্রশাসন। পরে ২৯ সেপ্টেম্বর আগের এক ইজারাদারের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তিন মাসের জন্য বালু উত্তোলন স্থগিত করেন। ফলে যাদুকাটা নদী বর্তমানে ইজারাবিহীন অবস্থায় রয়েছে।
তবে নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইজারা স্থগিত থাকলেও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। নদীর তীর কেটে বালু তোলায় বসতভিটা ও আশপাশের জনপদ হুমকির মুখে পড়েছে।
আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও ধোপাজানে বালু উত্তোলন
সুনামগঞ্জ শহরতলির ধোপাজান বালুমহালেও একই পরিস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৮ সালে ধোপাজান কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের আদেশ দেন আদালত।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেখানে আবার বালু উত্তোলন শুরু হয়। সমালোচনার মুখে প্রশাসনের তৎপরতায় তা বন্ধ হয়। পরে গত বছরের অক্টোবরে সরকারি সিদ্ধান্তে ধোপাজানে পুনরায় বালু উত্তোলন শুরু হলে আবারও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রশাসন সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করলেও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অভিযান চান পরিবেশকর্মীরা
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের ফলে ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন হচ্ছে এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হচ্ছে। লোকদেখানো অভিযানের পরিবর্তে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড সম্ভব নয়। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে স্থানীয় বালু উত্তোলনকারীরা নিজেদের অবস্থান বদলে নতুন প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে চলে যান বলে তাঁর অভিযোগ। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইজারাবিহীন নদীতে বালু উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান। তিনি বলেন, জেলার চারটি বালুমহালের মধ্যে যাদুকাটা ও মরাচেলা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে প্রশাসন নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করছে।
আরও পড়ুন:







