বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি সর্বস্বীকৃত মুসলিম প্রধান দেশ—যেখানে ৯১ শতাংশেরও বেশি মুসলমান বসবাস করে। অথচ এই বাংলাদেশেই কখনো কখনো ইসলাম গ্রহণের মতো একটি ধর্মীয় সিদ্ধান্ত নওমুসলিমদের জন্য ডেকে আনে চরম নিরাপত্তাশঙ্কা।
অভিযোগ উঠেছে, ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মারিয়া ইসলাম ওরফে মনিকা রানী নামের এক হিন্দু তরুণী ইসলাম গ্রহণের পর তাকে, জোরপূর্বক ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অভিযোগটি বাংলা এডিশনের হাতে আসতেই ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে মাঠে নামে বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী দল। সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় একাধিক সূত্রের সঙ্গে, সামনে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ধর্মান্তর ও বিয়ের পর ঘটনার পরিবর্তন
জানা যায়, মারিয়া ইসলাম ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের খালফলিয়া গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বী বিপুল বাড়ই ও দিপালী বাড়ইয়ের মেয়ে। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে যার নাম ছিল মনিকা রানী। গত জুলাই মাসে সে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে জেলা নোটারি পাবলিক কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এফিডেভিট সম্পাদন করে। পরবর্তীতে আগস্টে রাকিবুল ইসলাম নামের এক ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করে বলে জানা যায়।
কিন্তু, এর মধ্যেই পালটে যেতে থাকে ঘটনার চিত্রপট। অভিযোগ রয়েছে, ধর্মান্তরের পর থেকেই মারিয়াকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছিল তার পরিবার। সেই সঙ্গে সনাতন ধর্মে ফিরে আসার জন্য নানা হয়রানির অভিযোগও সামনে আসে মারিয়ার পরিবারের বিরুদ্ধে।
পরে শৈলকুপা থানায় মারিয়ার পরিবার তাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে অভিযোগ দায়ের করলে মারিয়াকে হাজির করতে থানা থেকে স্বামীর পরিবারকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। এমনকি মারিয়াকে থানায় হস্তান্তর না করায় মেয়েটির স্বামী রাকিবুলের বড় ভাই রানা বিশ্বাসকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।
থানায় হস্তান্তর ও ভিডিও প্রমাণ
পরিবারের দাবি, এরপর বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) মারিয়াকে থানায় উপস্থিত করা হলে তাকে জোরপূর্বক তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। অপরদিকে, টিম বাংলা এডিশনের হাতে আসা একটি ভিডিওতেও প্রমাণ মেলে ঘটনার সত্যতার। ভিডিওটিতে মেয়েটিকে কেঁদে কেঁদে বলতে শোনা যায়, সে তার স্বামীকে ছেড়ে যেতে চায় না। তবুও তাকে জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
এদিকে, অপ্রাপ্তবয়স্কের অভিযোগ এনে মারিয়াকে তার পরিবারের কাছে তুলে দেয়া হলেও বাস্তবে জন্মনিবন্ধনে পাওয়া যায় তার ভিন্ন চিত্র। মারিয়ার জন্মনিবন্ধনের তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, সে ২০০৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন, যা বিশ্লেষণ করলে তার বর্তমান বয়স দাঁড়ায় ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দাঁড়ায়—১৮ উর্ধ্ব একটি মেয়ে কীভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়? সেই সঙ্গে পুলিশ কিসের ওপর ভিত্তি করে একজন পূর্ণবয়স্ক মেয়েকে তার ইচ্ছের বিপরীতে গিয়ে জোরপূর্বক তার পরিবারের হাতে তুলে দেয়?
থানায় সরেজমিন অনুসন্ধান
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সরেজমিনে শৈলকুপা থানায় উপস্থিত হয় বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী দল। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে কথা হয় ওসি তদন্তের সঙ্গে। ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা হয় তার বক্তব্য।
ওসি তদন্তের দাবি, মেয়েটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল বলেই তাকে পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হয়।
কিন্তু মারিয়ার অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার দাবির সত্যতা যাচাইয়ে তার জন্মনিবন্ধন যাচাই করা হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে থানার ওই কর্মকর্তা নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
অন্যদিকে ধর্মান্তরিত ও বিবাহিত তরুণীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিবারের কাছে তুলে দেওয়ার বিষয়ে আদালতের কোনো নির্দেশনা ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে, আইনি প্রক্রিয়ার বদলে ঘটনাটিকে সামাজিক বিচারের আদলে রফাদফার কথা জানান ওসি তদন্ত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রাপ্তবয়স্ক একজন তরুণীকে কি তার নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা করে, সামাজিক বিচারের আদলে পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া যায়? আর যদি আইনগত প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন শুধু দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েই নয়; প্রশ্ন ওঠে আইনের শাসন ও বিচারিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও।
ভারতে পাঠানো ও দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ
এদিকে, স্বামী রাকিবুল ইসলামের অভিযোগ, তার বৈধ স্ত্রী মারিয়া ইসলামকে জোরপূর্বক ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে তার শ্বশুরবাড়ির লোকদের ভারতের নাগরিকত্বসহ দুই দেশের দ্বৈত নাগরিকত্বের কথাও উঠে আসে তার বক্তব্য থেকে।
দুই দেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব ও মারিয়াকে ভারতে পাঠানইর অভিযোগ—তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে সরেজমিনে শৈলকুপা উপজেলার খালফলিয়া গ্রামে মারিয়ার বাড়িতে উপস্থিত হয় টিম বাংলা এডিশন।
বাড়িতে গিয়ে মারিয়া কিংবা তার বাবা-মায়ের কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি। তার ছোট বোন ও মামির সঙ্গেও কথা বলার চেষ্টা করা হলে তারা ক্যামেরার সামনে আসতে নারাজ।
তবে গ্রামের স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার বক্তব্যে উঠে আসে, মারিয়াকে জোরপূর্বক ভারতে পাঠিয়ে দেয়ার আশংকার কথা।
সেইসঙ্গে গ্রামের অনেক হিন্দুর ভারত-বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্বের ইঙ্গিতও পাওয়া যায় তাদের বক্তব্যে।
এখন মারিয়ার স্বামী রাকিব ও তার পরিবারের একটাই দাবি—তার স্ত্রী মারিয়া সুস্থভাবে তাদের কাছে ফিরে আসুক।
এদিকে, পুলিশের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা এডিশনকে জানান, হিন্দু মহাজোটের সদস্য পরিচয়ে একদল হিন্দু ব্যক্তি স্থানীয় বিএনপির এক নেতার যোগসাজশে পুলিশকে প্রভাবিত করে। তবে, নিরাপত্তার স্বার্থে ওই বিএনপি নেতার নাম বলতে রাজি হননি পুলিশের ওই সদস্য।
মারিয়া কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। তবে প্রশ্ন থেকে যায় আরও বড়—একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিজের জীবন বেছে নেয়ার অধিকার যদি তার নিজের কাছেই না থাকে, তাহলে আইনের শাসন আসলে কার জন্য? তাই মারিয়াকে শুধু ফিরিয়ে আনাই নয়—তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন সময়ের দাবি। একইসাথে, বাংলাদেশে বসবাসকারী ওইসব হিন্দুদের দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে কি না? নিরাপত্তার ও স্বার্বভৌমত্বের স্বার্থে তাও খতিয়ে দেখা জরুরি।
আরও পড়ুন:







