হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালটি অবশেষে অপসারণ করা হয়েছে। গত দুই থেকে তিন দিন ধরে এক্সকাভেটর দিয়ে স্থাপনাটি ভাঙার কাজ চলে। পরে ভাঙা ইট, বালু ও রড ট্রাক্টরে করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাটি অপসারণের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তাঁদের কয়েকজনের মতে, পুরো কাঠামো অপসারণের আগে সেটি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যেত কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২২–২০২৩ সালের দিকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহানের উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের মাঠের দক্ষিণ পাশে ম্যুরালটি নির্মাণ করা হয়। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাটি প্রায় দেড় শতক জায়গাজুড়ে ছিল। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ ফুট এবং প্রস্থ ১৮ ফুট। আধুনিক টাইলস ও সিঁড়িসহ স্থাপনাটির ভিত্তিও বেশ উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় কয়েক দফায় ম্যুরালটি ভাঙার চেষ্টা করা হয়। সে সময় এটি ভাঙতে না পেরে এর গায়ে কালো কালি লাগানো হয়। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে স্থাপনাটি ওই অবস্থায় পড়ে ছিল।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ম্যুরালটি অপসারণের কাজ শুরু হয়। জেলা প্রশাসক জি এম সরফরাজের নির্দেশে সোহেল মিয়া নামের এক ঠিকাদারকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বর্তমানে যন্ত্রের সাহায্যে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, এক্সকাভেটর দিয়ে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ভাঙা হচ্ছে। পরে ভাঙা ইট, বালু ও রড ট্রাক্টরে করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আশপাশের লোকজন দাঁড়িয়ে অপসারণের কাজ দেখেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় সাতজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাঁদের কয়েকজনের মতে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাটি অপসারণের আগে এর কাঠামো অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা বিবেচনা করা যেত। পুরোনো কাঠামো ব্যবহার উপযোগী হলে সেখানে জেলার কৃতী ব্যক্তিদের ছবি, জেলার মানচিত্র কিংবা অন্য কোনো নান্দনিক স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেত।
হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এত টাকা খরচ করে নির্মাণ করা স্থাপনাটি পুরোপুরি অপসারণ না করে অন্যভাবেও কাজে লাগানো যেত। পুরোনো কাঠামোর ওপর নতুন কিছু করার সুযোগ ছিল কি না, তা বিবেচনা করা যেত।’
ম্যুরাল অপসারণের বিষয়ে ঠিকাদার সোহেল মিয়া বলেন, জেলা প্রশাসক জি এম সরফরাজ তাঁকে মৌখিকভাবে স্থাপনাটি ভাঙার দায়িত্ব দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছেন তিনি।
কাজের জন্য কত টাকা পাবেন, জানতে চাইলে সোহেল মিয়া বলেন, কাজ শেষ হওয়ার পর স্থাপনার ইট, বালু ও রডের মূল্য নির্ধারণ করে দেবেন জেলা প্রশাসক।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক জি এম সরফরাজ বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেখানে বঙ্গবন্ধু বা অন্য কোনো ম্যুরাল পাননি; পেয়েছেন নড়বড়ে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আংশিক ভাঙা একটি স্থাপনা। এর আশপাশ দিয়ে লোকজন চলাচল করেন। স্থাপনাটি ভেঙে পড়ে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই এটি অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, স্থাপনাটি সরিয়ে ফেলার পর ওই জায়গায় নতুন কিছু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের। পুরোনো ভিত্তি রেখে অন্য কিছু করা যেত কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছেন। স্থানীয় ব্যক্তিরা স্থাপনাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করায় তা অপসারণের পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ম্যুরালটি অপসারণের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে স্থাপনাটি নির্মাণে ব্যয় হওয়া অর্থের ব্যবহার এবং এর জায়গায় নতুন কী নির্মাণ করা হবে, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে তাঁদের।
আরও পড়ুন:







