শুক্রবার

৯ অক্টোবর, ২০২৬ ২৪ আশ্বিন, ১৪৩৩

কুমিল্লায় হত্যার শিকার শিক্ষার্থীর লাশ যশোরে দাফন; একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে সর্বস্বান্ত মা-বাবা

কে এম জারিদুল ইসলাম,যশোর

প্রকাশিত: ৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:৫৭

শেয়ার

কুমিল্লায় হত্যার শিকার শিক্ষার্থীর লাশ যশোরে দাফন; একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে সর্বস্বান্ত মা-বাবা
ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ যশোরে দাফন করা হয়েছে।

শুক্রবার সকাল ১০টায় যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তাজমিনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তার মা-বাবা। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা।

নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে সে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা শহরে থাকত। সেখানে স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়াতনের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত সে।

গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সুমন নামে সিএনজিচালিত অটোরিকশার এক চালককে আটক করা হয়েছে।

শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন তাজমিনের মা-বাবা ও স্বজনেরা। স্থানীয় সাংবাদিকেরা ছবি তুলতে গেলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তার মা কেয়া খাতুন।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘কী হবে এসব ছবি তুলে! আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে, এখন আর কিছু বলব না।’

মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতিচারণা করে কেয়া খাতুন বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়। সে বলেছিল, বান্ধবীর সঙ্গে আছে। আমাকে বলেছিল, বান্ধবীর বাড়িতে এসে নিয়ে যেতে। তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বান্ধবীর নাম কী, তার বাবা-মায়ের নাম কী? কিন্তু সে কিছু বলেনি।’

তাজমিনের মা দাবি করেন, মেয়ের বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লা শহরে একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তিনি বাকরুদ্ধ। মেয়ের নিখোঁজ হওয়া ও মৃত্যুর আগের ঘটনাগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাবে বলে মেয়ে বাসা থেকে বের হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ে আমাকে মেসেজ ও লাইভ লোকেশন পাঠায়। মেসেজে তাকে এসে নিয়ে যেতে বলে। তখন আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। সকালে মেসেজ দেখে লাইভ লোকেশনে গিয়ে দেখি, মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে।’

আবদুল আলীম বলেন, ‘এখন আমি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে চাই না। আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, কারা তাকে হত্যা করেছে, পুরো ঘটনা জানতে চাই। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানাই।’

স্থানীয়রা জানান, তাজমিনের কোনো ভাই-বোন ছিল না। সে মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। বিভিন্ন ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসত। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

যেভাবে কুমিল্লায় পৌঁছায় তাজমিন পুলিশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পরও তাজমিন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। একপর্যায়ে সে কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে যায়। বুধবার দুপুরের পর কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পদুয়ার বাজারে নামার পর তাজমিন কীভাবে লালমাইয়ের জগতপুর এলাকার ধানক্ষেতে পৌঁছায়, তা তদন্ত করে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, ‘নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির বিষয়েও তদন্ত চলছে। আমরা অটোরিকশা ধরে তদন্ত এগোচ্ছি।’

কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের ধানক্ষেতজুড়ে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে এসব চিহ্ন দেখা গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, জীবন বাঁচাতে হত্যাকারীদের হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিল কিশোরীটি।

এ ঘটনায় নিহতের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।