ভোলার লালমোহনের মো. রাসেলকে বৈধ কাজের আশ্বাস দিয়ে ইতালি পাঠিয়ে ঘরবন্দি করে রাখার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। একপর্যায়ে তাঁকে অন্যত্র ‘শ্রমদাস’ হিসেবে বিক্রির চেষ্টা করা হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ইতালি পুলিশের সহায়তায় রাসেল জানতে পারেন, তাঁকে যে স্পন্সরের ভিত্তিতে ইতালি নেওয়া হয়েছিল, সেটি সম্পূর্ণ ভুয়া।
এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মানবপাচার ও অভিবাসন ট্রাইব্যুনালে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের মো. হাসান আলীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন রাসেল। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন। সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবদুল হাকিম তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর ৬ ও ৭ ধারায় অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চার আসামি হলেন চক্রের মূল হোতা চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের মো. হাসান আলী (৪৬), তাঁর বেয়াই মো. সাঈদ (৩৮), ভাই মো. হোসেন খান (৪২) এবং মো. জাবেদ (২৮)। তবে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলেও তাঁদের কেউ এখনো গ্রেপ্তার হননি।
সিআইডির উপপরিদর্শক মো. আবদুল হাকিম জানিয়েছেন, তদন্তে যা পাওয়া গেছে, সেটিই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা আদালত নেবেন।
সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর মোস্তফা কামাল জানান, সাত মাস ধরে নিজস্ব বিচারক না থাকায় প্রতিবেদনে সত্যতা পাওয়ার পরও এ ধরনের ১০০ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার হচ্ছে না। জেলা ও দায়রা জজ (ভারপ্রাপ্ত) বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে বিষয়টি দেখছেন। সেখানে মাঝেমধ্যে শুনানি হয়, যা মানবপাচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচার পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, সিআইডির প্রতিবেদন গ্রহণের বিষয়ে আদালতের আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটি। আদেশ হওয়ার পর আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চুক্তিতে বৈধ ভিসা ও চাকরির আশ্বাস
মামলার অভিযোগ ও সিআইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার নয়াপল্টনে রাসেলের চাচার অফিসে হাসান আলীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। হাসানের প্রলোভনে পড়ে ইতালিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রাসেল। ২০২৩ সালের ২০ মার্চ নয়াপল্টনের একটি অফিসে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে তাঁদের মধ্যে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ১৫ লাখ টাকা দিলে বৈধ ইতালিয়ান স্পন্সর ভিসা, পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট কার্ড (পিআরসি) ও চাকরি দেওয়ার কথা ছিল।
পরে প্রসেসিং, ভিসা ফি, ম্যানপাওয়ার ও টিকিটের খরচের কথা বলে ধাপে ধাপে মোট ১৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর টার্কিশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে ইতালি পৌঁছানোর পর হাসান আলীর নির্দেশে তাঁর বেয়াই সাঈদের কাছে যান রাসেল। সাঈদ তাঁকে ইতালির নেপোলির পালমা ক্যাম্পানিয়ায় একটি কক্ষে নিয়ে এক মাস আটকে রাখেন বলে অভিযোগ। বৈধ কোনো কাজ না দিয়ে অন্য এক ব্যক্তির কাছে তাঁকে বাধ্যতামূলক ‘শ্রমদাস’ হিসেবে বিক্রির জন্য দেনদরবার শুরু করেন সাঈদ।
বিষয়টি বুঝতে পেরে রাসেল সাঈদের পা ধরে বৈধভাবে কাজ দেওয়ার এবং অন্য কারও কাছে তুলে না দেওয়ার অনুরোধ করেন। একপর্যায়ে বিষয়টি গোপনে দেশে মামাকে জানালে তিনি পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
পরে রাসেলের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সাঈদ বৈধ স্পন্সরের জন্য আরও চার লাখ টাকা দাবি করেন। এতে রাজি হয়ে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন রাসেল। ২০২৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নয়াপল্টনের কার্যালয়ে হাসান আলীকে তাঁর ভাই হোসেন খান ও জাবেদের উপস্থিতিতে অতিরিক্ত চার লাখ টাকা দেন তিনি। বিমান টিকিটের জন্য আরও এক লাখ টাকা নিজে খরচ করেন।
দ্বিতীয়বার ইতালি গিয়েও বন্দি রাসেল
২৮ এপ্রিল সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনসের এসভি ৮০৫ ফ্লাইটে পুনরায় ইতালি যান রাসেল। অভিযোগ অনুযায়ী, দ্বিতীয়বার ইতালি পৌঁছানোর পরও তাঁকে কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। একটি কক্ষে আটকে রেখে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং সাঈদ গোপনে তাঁকে অন্য লোকের কাছে বিক্রির চেষ্টা করেন।
পরিস্থিতি বুঝে সেখানে থাকা বরিশালের এক ব্যক্তির সহায়তায় দরজার লক খুলে পালিয়ে যান রাসেল। পরে পূর্বপরিচিত আজাদের কাছে আশ্রয় নেন। আজাদের সহায়তায় ৮ জুলাই ইতালি পুলিশের শরণাপন্ন হলে কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, মূল মালিকের স্বাক্ষর জাল করে ওই স্পন্সর তৈরি করা হয়েছে।
ইতালি পুলিশের সহায়তায় স্বজনদের পাঠানো বিমানের টিকিটে ১৫ জুলাই সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফেরেন রাসেল।
ভুক্তভোগী রাসেলের দাবি, এটি একটি চক্র এবং তাঁর মতো আরও অনেকের সঙ্গে একইভাবে প্রতারণা করা হয়েছে। ইতালি যাওয়ার আগে তিনি জাল স্পন্সরের বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইতালির এক আইনজীবীর মাধ্যমে মূল মালিকের স্বাক্ষর জাল করে স্পন্সরটি তৈরি করা হয় এবং ওই আইনজীবীরাও পরে জেলে যান। ইতালি পুলিশই তাঁকে প্রথম জানায় যে স্পন্সরটি সম্পূর্ণ ভুয়া।
রাসেল আরও জানান, চক্রটি তাঁর কাছ থেকে ১৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা ছাড়াও আরও নগদ অর্থ নিয়েছে। তবে সেসব লেনদেনের কোনো প্রমাণ না থাকায় সিআইডির প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয়নি।
চার আসামির শাস্তি দাবি করে রাসেল বলেন, সাঈদ ইতালিতে এবং হাসানসহ অন্যরা দেশে অবস্থান করছেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁরা সংঘবদ্ধভাবে এ কাজ করেছেন। তিনি আদালতের কাছে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
আরও পড়ুন:







