মঙ্গলবার

৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২০ আশ্বিন, ১৪৩৩

৫ তারিখে ভারতবিরোধী পোস্ট; পরের দিন আবরারকে হত্যা

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:১৪

শেয়ার

৫ তারিখে ভারতবিরোধী পোস্ট; পরের দিন আবরারকে হত্যা
ছবি সংগৃহীত

শনিবার (৫ অক্টোবর ২০১৯) বিকেল ৫টা ৩২ মিনিটে কুষ্টিয়ার নিজ বাড়িতে বসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক্স প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ।

সেই পোস্টে তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিভিন্ন অসম চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেন। দেশভাগের পর কলকাতা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ না পেলেও দুর্ভিক্ষ দমনে তড়িঘড়ি মোংলা বন্দর খুলে দেয়ার ইতিহাস মনে করিয়ে দেন তিনি। পাশাপাশি প্রতিদান ছাড়া ফেনী নদীর দেড় লাখ কিউবিক মিটার পানি প্রদান এবং দেশে তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও, ভারতে গ্যাস রপ্তানি করার চুক্তির কড়া সমালোচনা করেছিলেন তরুণ আবরার ফাহাদ।

পোস্টের পরদিন হত্যা

পোস্ট দেয়ার পরদিন, অর্থাৎ রবিবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে বাড়ি থেকে, বুয়েটের শের-এ-বাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে ফেরেন আবরার। ওইদিন রাত ৮টার দিকে বড় ভাইদের কথা বলে তাকে ডেকে নেয়া হয় ওই হলেরই ২০১১ নম্বর কক্ষে। সেখানে আবরারের মোবাইল ফোন ঘেটে, ভারতের বিরুদ্ধে লেখার অযুহাতে তার ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে দফায় দফায় পেটাতে থাকে তাকে। মারধরের এক পর্যায়ে আবরার বমি করে ফেললে তাকে ধুয়ে মুছে এনে আবারও পেটানো হয়। ওইদিনই রাত ৩টার দিকে হলের সিঁড়িতে আবরারকে মৃত অবস্থায় ফেলে রেখে যায় সেই বড় ভাইয়েরা।

পরবর্তীতে তদন্তে বেরিয়ে আসে, ভিন্নমত প্রকাশ, ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি করতেই আবরার ফাহাদকে মিথ্যা 'শিবির' ট্যাগ দিয়ে, ওই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

আবরার হত্যার পর দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়া

আবরার হত্যার পর ফুঁসে ওঠে বুয়েটসহ গোটা দেশ। শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব আন্দোলনের মুখে বুয়েটে চিরতরে নিষিদ্ধ হয় ছাত্র রাজনীতি। পলাশীতে নির্মিত হয় 'আগ্রাসনবিরোধী স্মৃতিস্তম্ভ'। আবরার ফাহাদ হয়ে ওঠেন সার্বভৌমত্ব ও ভারতীয় আগ্রাসনবিরোধী প্রতিবাদের এক প্রতীক।

এদিকে, সাত বছর আগের সেই শনিবার (৫ অক্টোবর)-এর পোস্টটির কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন আবরারের ছোট ভাই আবরার ফায়াজ।

একই সঙ্গে অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে আবরারের সেই দেশপ্রেমী প্রতিবাদের কথা মনে করিয়ে দেন।

বিচার ও রায়

আবরার হত্যার পর তার বাবা বরকত উল্লাহ চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করলে গোয়েন্দা পুলিশ মাত্র ৩৭ দিনে তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দেয়।

বুধবার (৮ ডিসেম্বর ২০২১) বিচারিক আদালত বুয়েট ছাত্রলীগের ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন, যা পরবর্তীতে হাইকোর্টেও বহাল থাকে। তবে বিচার শেষ হলেও এত বছর পাড় হয়ে যাওয়ায় আসামিদের রায় কার্যকর না হওয়ায় বুকভাঙা কষ্টে দিন কাটাচ্ছে আবরারের পরিবার।

রায় ঘোষণার এতদিন পরও সাজাপ্রাপ্ত চারজন আসামি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের মধ্যে ৩ জন আগে থেকেই পলাতক থাকলেও, সোমবার (৫ আগস্ট ২০২৪) জেল ভেঙে পালিয়ে যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরও এক আসামি। আবরারের পরিবারের অভিযোগ, আসামি পালানোর খবরটি শুরুতে গোপন রাখার কারণেই তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

পরিবারের আক্ষেপ

সন্তান হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এই পরিবারটির আক্ষেপ, সময় গড়ানোর সাথে সাথে তাদের কথা ভুলতে বসেছে সবাই।

আবরার ফাহাদের স্মৃতি ও তার চিন্তা-চেতনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে বাঁচিয়ে রাখার আবেদন জানিয়েছে তার বাবা।

সাত বছর আগের সেই শনিবার (৫ অক্টোবর ২০১৯)-এর পোস্টটি কেবল একটি লেখা নয়, বরং বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার এক অনন্য দলিল। ঘাতকের নির্মম নির্যাতনে আবরারের দেহ স্তব্ধ হয়ে গেলেও, দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে তার তুলে ধরা প্রশ্নগুলো আজ কোটি মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত বলে মনে করে সচেতন মহল।