শুক্রবার

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৭ কার্তিক, ১৪৩৩

টিলা কেটে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে মাটি বিক্রির অভিযোগ, বাধা দেয়ায় হামলা

শেখ বেলাল,হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫:২৪

শেয়ার

টিলা কেটে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে মাটি বিক্রির অভিযোগ, বাধা দেয়ায় হামলা
ছবি: বাংলা এডিশন

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলখ্যাত দিনারপুর পরগনায় ফের বাণিজ্যিকভাবে পাহাড় ও টিলা কাটার অভিযোগ উঠেছে। এক্সক্যাভেটর দিয়ে টিলা কেটে সেই মাটি ট্রাকযোগে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নির্মীয়মাণ একটি সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এ ঘটনায় টিলা কাটায় বাধা দিতে গিয়ে দেবপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ওপর হামলার অভিযোগও উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনারপুর পরগনার আইনগাঁও এলাকায় বাড়ি নির্মাণের অনুমতি নেওয়ার আড়ালে একটি চক্র বাণিজ্যিকভাবে পাহাড় ও টিলা কাটছে। গত শুক্রবার রাতে এক্সক্যাভেটর দিয়ে টিলা কাটার সময় স্থানীয়রা বাধা দিলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন শনিবার রাতে আবারও টিলা কাটার কাজ শুরু হলে দেবপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট জালাল আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক মুরশেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে স্থানীয় কয়েকজন সেখানে গিয়ে বাধা দেন। এ সময় টিলা কাটায় জড়িত ব্যক্তিরা তাদের ওপর হামলা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

খবর পেয়ে নবীগঞ্জ থানার গোপলার বাজার পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে টিলা কাটার কাজ বন্ধ করে দেন। পরদিন রোববার সকালে নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিরুদ্ধ দেব রায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পাহাড় বা টিলা কাটার কোনো অনুমতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। একজন ব্যক্তি বাড়ি নির্মাণের জন্য অনুমতি নিয়েছিলেন। তবে তিনি অনুমোদিত স্থানে কাজ না করে অন্য জায়গায় কাজ করেছেন। যে টিলা কেটে মাটি বিক্রি করা হয়েছে, সেটিও তাঁর নামে রেকর্ডভুক্ত নয়। বাড়ি নির্মাণের অনুমতির অপব্যবহার করে টিলা কাটার অভিযোগের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দেবপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট জালাল আহমদ বলেন, উপজেলা প্রশাসন পাহাড় বা টিলা কাটার অনুমতি দিতে পারে না। সম্প্রতি একজন ব্যক্তি বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য আবেদন করলে জমির শ্রেণি পরিবর্তন না করার শর্তে বাড়ি নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু ওই অনুমতিপত্রের অপব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে টিলা কাটা হচ্ছিল। খবর পেয়ে সেখানে গেলে তাদের ওপর হামলা করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুরশেদ চৌধুরীর অভিযোগ, আইনগাঁও এলাকায় শুক্রবার রাতে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে এক্সক্যাভেটর দিয়ে পাহাড় ও টিলা কাটা হয়। শনিবার রাতে দ্বিতীয় দফায় টিলা কাটার সময় বাধা দিতে গেলে তাদের ওপর হামলা করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। রোববার সকালে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে টিলা কাটার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী কয়েকজনের সহযোগিতায় রুনু বেগমের নামে অনুমতি এনে সালেহ, শায়েম, আউয়াল ও আশরাফ আলীর তত্ত্বাবধানে একটি চক্র এক্সক্যাভেটর দিয়ে টিলা কাটছে। পরে ট্রাকভর্তি মাটি পার্শ্ববর্তী দেবপাড়া ইউনিয়নের আইনগাঁও এলাকায় নির্মীয়মাণ একটি সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলে তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে রুনু বেগম বলেন, তাঁর মালিকানাধীন পাহাড় থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী মাটি কাটা হচ্ছে। তাঁর দেবররা ওই মাটি পার্শ্ববর্তী বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিক্রি করছেন। ব্যবসার উদ্দেশ্যে মাটি বিক্রি করা নিষিদ্ধ—এ বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ, বাহুবল, চুনারুঘাট ও মাধবপুরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় ও টিলা কেটে পরিবেশের ক্ষতি করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নবীগঞ্জে নিয়মিত পাহাড়-টিলা কাটার অভিযোগ থাকলেও তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। টিলা কাটার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি পাহাড় ও টিলা সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিরুদ্ধ দেব রায় বলেন, রাতে পাহাড় কাটার অভিযোগ পেয়ে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। রুনু বেগম বাড়ি নির্মাণের অনুমতি নিয়ে থাকলে এবং সেই অনুমতির অপব্যবহার করে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাহাড় কাটার কোনো অনুমতি তাঁকে দেওয়া হয়নি।

নবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আবুল হোসেন বলেন, শনিবার রাতে পাহাড় কাটা নিয়ে দুই পক্ষের মারামারির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। পরে সকালে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়েছেন।

নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন বলেন, বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জমির শ্রেণি পরিবর্তন না করার শর্তে শুধু বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য সীমিত পরিসরে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাহাড় বা টিলা কাটার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। প্রশাসনের অনুমতির বাইরে গিয়ে কেউ কাজ করে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।