শুক্রবার

২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

বগুড়ায় রাজনৈতিক বিবেচনায় মিনি কোল্ড স্টোরেজ বরাদ্দের অভিযোগ

আবুল কালাম আজাদ, বগুড়া

প্রকাশিত: ২ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:২২

শেয়ার

বগুড়ায় রাজনৈতিক বিবেচনায় মিনি কোল্ড স্টোরেজ বরাদ্দের অভিযোগ
ছবি: বাংলা এডিশন

কৃষকের উৎপাদিত সবজি সংরক্ষণ করে লোকসান ঠেকাতে বগুড়ার তিন উপজেলায় স্থাপন করা হয়েছে আটটি সৌরশক্তিচালিত মিনি কোল্ড স্টোরেজ। কিন্তু স্থাপনের আট মাস পার হলেও অধিকাংশই পড়ে আছে তালাবদ্ধ অবস্থায়। চালু থাকা কয়েকটিরও ব্যবহার সীমিত। কোথাও গ্রিডের বিদ্যুৎ দিয়ে চালানো হলেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে না। আবার কোথাও সংরক্ষিত সবজির বদলে কোল্ড স্টোরেজের ভেতরে শিশুদের খেলতে দেখা গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, কৃষকের প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনার বদলে রাজনৈতিক প্রভাব ও সুবিধা বিবেচনায় এসব কোল্ড স্টোরেজ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ফলে কৃষকের জন্য নেয়া প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারছে না। যদিও রাজনৈতিক বিবেচনায় বরাদ্দের অভিযোগের বিষয়ে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে দেশে কৃষক পর্যায়ে মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বগুড়ায় দুই ধাপে মোট আটটি কনটেইনারভিত্তিক (টিএসসিসি) মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হয়। সবজি ও আলু উৎপাদন বেশি হওয়ায় শিবগঞ্জে চারটি, গাবতলীতে তিনটি এবং সারিয়াকান্দিতে একটি স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি হিমাগার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল কৃষকের উৎপাদিত সবজি ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করে বাজারে সরবরাহের সময় বাড়ানো এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে কৃষকের লোকসান কমানো। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ কোল্ড স্টোরেজ কৃষকের কাজে ব্যবহার হচ্ছে না।:

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোল্ড স্টোরেজগুলোর কয়েকটি পেয়েছেন রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তি ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। মহাস্থান হাটের পাশে স্থাপন করা একটি কোল্ড স্টোরেজ পেয়েছেন স্থানীয় বিএনপির পদধারী নেতা তাহেরুল ইসলাম। অপরদিকে গাবতলী ও শিবগঞ্জের কয়েকটি কোল্ড স্টোরেজ নিয়েও স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে—এসব প্রকল্পের প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কৃষকের প্রয়োজন কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষকদের সংগঠনের মাধ্যমে সমবায়ী ব্যবস্থাপনায় কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনার কথা থাকলেও বাস্তবে কয়েকটি ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ—ব্যাহত হচ্ছে।

মহাস্থানে কোল্ড স্টোরেজ, ভেতরে শিশুর খেলা:

মহাস্থন হাট এলাকার অদূরে মনিতলায় স্থাপন করা একটি কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনা করছেন লিড এগ্র টেকের কর্ণধার মো. রকনুল ইসলাম রোকন।

সরেজমিনে দেখা যায়, কনটেইনার সদৃশ কোল্ড স্টোরেজটি চালু রয়েছে। ভেতরে সারি করে রাখা হয়েছে খালি ক্যারেট। মেঝেতে রেক্সিন বিছানো। সেখানে বসে পাঁচ বছরের একটি শিশু খেলছিল। তবে কোনো সবজি সংরক্ষিত ছিল না।

কৃষিতে ডিপ্লোমাধারী রকনুল ইসলাম বলেন, প্রায় আট মাস আগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কোল্ড স্টোরেজটি দেওয়া হয়েছে। প্ল্যাটফর্ম তৈরি, বিদ্যুতের তার, ক্যারেটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনতে তাঁর নিজস্ব প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কোল্ড স্টোরেজটিতে সৌরবিদ্যুৎ, লিথিয়াম ব্যাটারি ও মূল গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে তিনি গ্রিডের বিদ্যুৎ দিয়েই এটি চালাচ্ছেন। এতে মাসে প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে।

কোল্ড স্টোরেজে সবজি না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কাঁচামরিচ ১৪ দিন রেখে লোকসান খেয়েছি। সরকার হঠাৎ করে আমদানি শুরু করায় দাম কমে যায়। শেষ পর্যন্ত কেনা দামের চেয়ে ১৫ টাকা কম দরে বিক্রি করেছি। বিটরুট ও লেবুও রেখেছিলাম। এখন কিছু রাখিনি। খুব গরম, তাই ছেলে ভেতরে খেলা করছে।’

কৃষকদের নিয়ে সংগঠনের মাধ্যমে কোল্ড স্টোরেজ পরিচালিত হচ্ছে কি না জানতে চাইলে রকনুল ইসলাম বলেন, ১৫ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। তবে তিনি যে দুজন সদস্যের নাম উল্লেখ করেন, তাদের একজন তাঁর বাবা এবং অন্যজন তাঁর বন্ধু।

বিএনপি নেতার কোল্ড স্টোরেজ তালাবদ্ধ:

মহাস্থন হাটের একেবারে পাশে আরেকটি কনটেইনারভিত্তিক কোল্ড স্টোরেজ পেয়েছেন তাহেরুল ইসলাম। তিনি স্থানীয় বিএনপির একজন পদধারী নেতা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কোল্ড স্টোরেজটি তালাবদ্ধ।

তাহেরুল ইসলাম বলেন, ‘এটা বসিয়ে দিয়ে গেছে। এরপর পটল ও ঢ্যাঁড়শ অল্প সময়ের জন্য রেখেছিলাম। তারপর আর কিছু রাখিনি। ব্যবহার কীভাবে করতে হয়, সেটাও বুঝতে পারছি না।’

তিনি জানান, কয়েক দিন আগে প্রকল্প পরিচালক ঢাকাসহ কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা এসে কোল্ড স্টোরেজটি পরিদর্শন করেছেন। তাঁদের কাছে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।

‘সবজি কেউ না রাখলে কী করব’:

গাবতলীর বাগবাড়িতে স্থাপন করা আরেকটি কনটেইনারভিত্তিক কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনা করছেন মো. রেজওয়ানুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে চালু করি, আবার বন্ধ রাখি। সবজি কেউ রাখতে না চাইলে কী করব?’

মোকামতলার মো. সুজাউল ইসলামও প্রায় একই কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, ‘এটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু কৃষকেরা এখনো বিষয়টি বুঝতে পারছেন না।’

বছরে নষ্ট ১ লাখ ১২ হাজার টনের বেশি সবজি:

বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. মাহফুজ আলম বলেন, জেলায় বছরে পাঁচ লাখ টনের বেশি সবজি উৎপাদিত হয়। সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৬৫৮ টন সবজি বিক্রি না হয়ে পচে নষ্ট হয়। এসব সবজির বাজারমূল্য প্রায় ৩৯৫ থেকে ৪০০ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, কৃষকদের এই ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে দেশে ১০০টি কনটেইনারভিত্তিক মিনি হিমাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বগুড়ায় ইতোমধ্যে আটটি স্থাপন করা হয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে মাহফুজ আলম বলেন, ‘প্রথম অবস্থায় কিছু সমস্যা হচ্ছে। তবে সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে।’

বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, ‘যেসব অভিযোগ পেয়েছি, সেগুলো নোট রাখা হচ্ছে। কয়েক দিন আগে হিমাগার নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবায়ের মাসরুর এসেছিলেন। তাঁদেরও কিছু ফাইন্ডিংস রয়েছে। সব মিলিয়ে সমস্যাগুলোর সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে।’

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। এখন উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করা জরুরি। কৃষক পর্যায়ে ছোট কোল্ড স্টোরেজ ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের অপচয় কমানো সম্ভব। তবে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে হলে সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং সমবায়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।