ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সরকারি কলেজের সামনে কাশবনের ভেতর হাত-পা ও মুখ স্কচটেপে বাঁধা অবস্থায় আরজান মিয়া ওরফে আবদুল্লা (১৯) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। হত্যার পর লুটে নেয়া ভিভো মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে লুণ্ঠিত মোবাইল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। তদন্তে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত দুই মূল ঘাতককেও শনাক্ত করা হয়েছে।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ১১টার দিকে নাসিরনগর সদর ইউনিয়নের সরকারি কলেজের সামনে জসিম উদ্দিনের মার্কেটের দক্ষিণ পাশে কাশবনের ভেতর থেকে আরজান মিয়া ওরফে আবদুল্লার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তার দুই হাত, দুই পা ও মুখ স্কচটেপ দিয়ে প্যাঁচানো ছিল। হাঁটুর ওপর রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে ছিল মরদেহটি।
এর আগের দিন, ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার দিকে অটোরিক্সাসহ নিখোঁজ হন আরজান। পরে তার মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি অটোরিক্সা ও ব্যবহৃত Vivo মোবাইল ফোনের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা মো. আ. আউয়াল বাদী হয়ে নাসিরনগর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ২২ সেপ্টেম্বর নাসিরনগর থানায় দায়ের করা মামলাটিতে দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় ২ অক্টোবর ২০২৬ পিবিআই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান এসআই (নিঃ) মো. শাহাদাত হোসেন।
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল (বিপিএম-সেবা)-এর সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ টিম তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ১ অক্টোবর হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. সামসু মিয়ার (২৩) হেফাজত থেকে নিহত আরজানের লুণ্ঠিত ভিভো মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়।
তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন হবিগঞ্জ সদরের পৌর মার্কেটের "সোহেল টেলিকম"-এ অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে চোরাই মোবাইল ফোন কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত সিহাব হোসেন (৩২) ও মো. রাহাব আলী ওরফে জুয়েলকে (৩২) গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যার পর লুটে নেয়া মোবাইল ফোনটি হবিগঞ্জ সদরের সোহেল টেলিকমে নিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা।
পিবিআইয়ের দাবি, গ্রেপ্তার সিহাব ও জুয়েল মোবাইলটি লুণ্ঠিত এ বিষয়টি জানার পরও মাত্র ২ হাজার ২০০ টাকায় সেটি কিনে নেয়। পরে অবৈধ লাভের আশায় মোবাইলটি সামসু মিয়ার কাছে ৩ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করা হয়।
তদন্তকারীদের কাছে দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে মোবাইলটির অবস্থান শনাক্ত ও উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
পিবিআইয়ের তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও তদন্তে জানা গেছে, ২০ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের লাখাইয়ের বামৈ-বল্লা বাজার এলাকা থেকে মো. তানভীর আহমেদ ওরফে তুহিন (৩৫) এবং রিমন ওরফে মো. মাহফুজুর রহমান (২৫) পূর্বপরিকল্পিতভাবে আরজানকে নিয়ে নাসিরনগরের দিকে আসে।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, নাসিরনগর এলাকায় আরজানকে হত্যার পর তার অটোরিকশা ও মোবাইল ফোন লুট করা হয়। পরে মরদেহ কাশবনের ভেতর ফেলে রেখে যায় তারা।
গ্রেপ্তার জুয়েল মূল ঘাতক তুহিন ও রিমনের পূর্বপরিচিত বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
পিবিআই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার পুলিশ সুপার বলেন, ক্লুলেস এই হত্যাকাণ্ডের পর পিবিআই দ্রুত ছায়াতদন্ত শুরু করে। নিবিড় তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ, পলাতক আসামিদের গতিবিধি পর্যালোচনা এবং সোর্সের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত লুণ্ঠিত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনটিই মামলার মূল জট খুলে দেয়। লুণ্ঠিত আলামত ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়া মূল ঘাতকদেরও শনাক্ত করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার সিহাব হোসেন ও রাহাব আলী ওরফে জুয়েলকে বিধি অনুযায়ী আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পিবিআই জানিয়েছে, তারা আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এদিকে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত বলে শনাক্ত তানভীর আহমেদ ওরফে তুহিন এবং রিমন ওরফে মাহফুজুর রহমান এখনো পলাতক রয়েছেন।
তাদের গ্রেপ্তারে পিবিআইয়ের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে লুণ্ঠিত অটোরিক্সা উদ্ধার এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য কোনো ব্যক্তি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে মামলার তদন্তও চলমান রয়েছে।
আরও পড়ুন:







