বৃহস্পতিবার

১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬ আশ্বিন, ১৪৩৩

ভারপ্রাপ্তের ভারে নুয়ে যাচ্ছে বিজয়নগর: ৩৩ সরকারি দপ্তরের ১১টিতে নেই নিয়মিত কর্মকর্তা

মোছাব্বির হাসান সজীব,ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:৫৮

শেয়ার

ভারপ্রাপ্তের ভারে নুয়ে যাচ্ছে বিজয়নগর: ৩৩ সরকারি দপ্তরের ১১টিতে নেই নিয়মিত কর্মকর্তা
ছবি: বাংলা এডিশন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে তীব্র জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। উপজেলার ৩৩টি সরকারি দপ্তরের মধ্যে অন্তত ১১টিতে নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় অন্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে একদিকে কর্মকর্তাদের ওপর বাড়ছে কাজের চাপ, অন্যদিকে ধীরগতি তৈরি হচ্ছে জনসেবায়। ফলে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দপ্তর বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে উপজেলা ভূমি অফিস, সমাজসেবা অধিদপ্তর, মৎস্য অফিস, প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়, উপজেলা শিক্ষা অফিস, সহকারী প্রোগ্রামার, হিসাবরক্ষণ অফিস, যুব উন্নয়ন অফিস, পল্লী উন্নয়ন অফিস, খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, সহকারী প্রকৌশলী (বিএডিসি), বিআরডিবি ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন।

শুধু প্রশাসনিক দপ্তরেই নয়, বিজয়নগরের প্রাথমিক শিক্ষা খাতেও রয়েছে বড় ধরনের জনবল সংকট। উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অনুমোদিত ১০০টি প্রধান শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৫২ জন। শূন্য রয়েছে ৪৮টি পদ।

ফলে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একই সঙ্গে পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের হিসাব-নিকাশ, দাপ্তরিক চিঠিপত্র, অনলাইন কার্যক্রম, প্রশাসনিক কাজ এবং উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভায় অংশ নিতে হচ্ছে তাঁদের।

শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্বের কারণে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একই সঙ্গে বাড়ছে শিক্ষকদের কর্মচাপও।

বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতেও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে অনুমোদিত ১২৮টি পদের মধ্যে ৫৮টি পদই শূন্য।

প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে। এতে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তি বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

জনবল সংকটের পাশাপাশি উপজেলার উন্নয়ন ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সড়কের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো কাজ শুরু হচ্ছে না। কোথাও কাজ শুরু হলেও তা দ্রুত শেষ না হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় মাদক ও চোরাচালান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তপথে মাদকদ্রব্য ও বিভিন্ন ধরনের চোরাচালানি পণ্য প্রবেশের ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে এলাকায় অনলাইন জুয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

এ ছাড়া রাতের আঁধারে পুকুর ও কৃষিজমি ভরাটের অভিযোগও রয়েছে। নৌ ও সড়কপথে বিভিন্ন ইটভাটায় কৃষিজমির মাটি পরিবহনের কারণে আবাদি জমি ও পরিবেশ ক্ষতির মুখে পড়ছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, একাধিক সরকারি দপ্তরে নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় সরকারি সেবার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দপ্তরের দায়িত্ব পালন করতে হলে তাঁর ওপর কাজের চাপ বাড়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও জনসেবা কার্যক্রমেও সময়ক্ষেপণ হতে পারে।

তাঁদের দাবি, দ্রুত শূন্য পদগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের চাপ কমাতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন জুয়া বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, আমরা এসপি, ডিসি ও এমপি মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং বিষয়টি তাঁদের অবগত করেছি। খুব শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সুমন ভূঁইয়া বলেন, জনবল সংকটের বিষয়টি জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দ্রুত জনবল নিয়োগ দেয়া হবে বলে আমরা আশাবাদী।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুর রহমান বলেন, শূন্য পদগুলো পূরণে পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি ও নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে প্রধান শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমে যাবে।

জনসেবার স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে দ্রুত শূন্য পদ পূরণ এবং অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ কমানোর পাশাপাশি উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন বিজয়নগরবাসী।



আরও পড়ুন: