বুধবার

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

রাজধানীতে আট মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৩৭

শেয়ার

রাজধানীতে আট মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন
ছবি সংগৃহীত

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। খাল, ঝিল, ফুটপাত, হাসপাতালের পাশ, পরিত্যক্ত ভবন ও নির্জন জায়গা থেকে মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি অনেকের শরীরে আঘাতের চিহ্নও পাওয়া যাচ্ছে। আবার পচন ধরে যাওয়ায় অনেক মরদেহের পরিচয় শনাক্তের সুযোগও নষ্ট হচ্ছে। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে রাজধানীতে ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে।

সর্বশেষ শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শ্যামপুর থানার জুরাইন রেলওয়ে সেতুর নিচে একটি পরিত্যক্ত পাবলিক টয়লেট থেকে আনুমানিক ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহটির মাথার অংশে পচন ধরে হাড় বেরিয়ে এসেছিল। কপালেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধারের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

পরিচয় না মেলায় মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, মরদেহে পচন ধরে যাওয়ায় সিআইডি ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিতে পারেনি। পরিচয় শনাক্তে এলাকায় প্রচারণা চালানো হলেও এখন পর্যন্ত কেউ কিশোরটির বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশ মরদেহের হিসাব এক নয়

জুরাইনের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি বছর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। তবে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোর হিসাবে, শুধু শাহবাগ থানা এলাকাতেই চলতি বছরে অন্তত ১১টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে।

তবে অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশ মরদেহের হিসাব এক নয়। উদ্ধারের সময় পরিচয় জানা না থাকলে কোনো মরদেহ অজ্ঞাত হিসেবে নথিভুক্ত হয়। এরপর পুলিশ পরিচয় শনাক্ত এবং স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে সেটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন বা সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়।

এ কারণে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহের হিসাবকে রাজধানীতে উদ্ধার হওয়া মোট অজ্ঞাত মরদেহের সংখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রায়েরবাজারে ৩২৬, জুরাইনে দাফন ৭৪ মরদেহ

আঞ্জুমানের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহের সৎকার করা হয়েছে। এর মধ্যে রায়েরবাজার কবরস্থানে ৩২৬টি এবং জুরাইন কবরস্থানে ৭৪টি মরদেহ দাফন করা হয়।

মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৩০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯টি, মার্চে ৫২টি, এপ্রিলে ৪৬টি, মে মাসে ৫৬টি, জুনে ৬৭টি, জুলাইয়ে ৪২টি এবং আগস্টে ৪৮টি মরদেহের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অর্থাৎ আট মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫০টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন বা সৎকার করেছে সংস্থাটি।

বেওয়ারিশ মরদেহ বেড়েছে কি না, নিশ্চিত নয় পুলিশ

এই পরিসংখ্যানকে রাজধানীতে অজ্ঞাত মরদেহ বৃদ্ধির সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখছে না পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এতসংখ্যক বেওয়ারিশ মরদেহ থাকার বিষয়ে তার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই।

ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার মিডিয়া মো. আক্তার হোসেন বলেছেন, বেওয়ারিশ মরদেহ বেড়েছে—এমন তথ্য পুলিশের কাছে নেই। বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুলিশের অনুমোদন ছাড়া কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না।

পচন ধরলে পরিচয় শনাক্তে বাড়ে সীমাবদ্ধতা

অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। নতুন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া মরদেহ থেকে আঙুলের ছাপ, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, মোবাইল ফোন, পোশাক কিংবা অন্যান্য ব্যক্তিগত সামগ্রীর মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের সুযোগ থাকে।

কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর মরদেহে পচন ধরলে আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তখন ডিএনএ পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য এবং স্বজনদের দেওয়া বর্ণনার ওপর নির্ভর করতে হয়। সব ক্ষেত্রে এসব সূত্রও পাওয়া যায় না।

সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পরিচয়হীন মরদেহের বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। নগরজীবনে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, গৃহহীনতা, একাকিত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

একই সঙ্গে কোনো মরদেহের পেছনে অপরাধ বা হত্যাকাণ্ড রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, পরিচয় শনাক্তে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার, হাসপাতাল, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।