কুমিল্লা নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে আসে খাদির ঐতিহ্য, লালমাই-ময়নামতির প্রাচীন প্রত্ননিদর্শন, পাহাড়ঘেরা প্রকৃতি আর ইতিহাস-সংস্কৃতির সমৃদ্ধ এক জনপদ। কিন্তু, সেই চেনা ছবির আড়ালেই যেন জন্ম নিচ্ছে অন্য আরেক কুমিল্লা—যেখানে অপরাধের অন্ধকারে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে আতঙ্কের ছায়া।
কোথাও হত্যা, কোথাও চুরি, কোথাও ডাকাতি আবার কোথাও অপহরণ কিংবা ধর্ষণ। একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনায় পরিসংখ্যানের পাতায় জমছে শুধু অপরাধের সংখ্যা। ২০২৬ সালের অপরাধের পরিসংখ্যান বলছে, কুমিল্লায় চলতি বছর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১০৪টি, চুরির ঘটনা ৩৬৮টি, ডাকাতি ৩৪টি, অপহরণ ১৫টি, আর ধর্ষণের ঘটনা ১৭টি। একই সময়ে অপমৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে ৪৫৭টি।
কিন্তু, এই সংখ্যার আড়ালে থাকা প্রশ্নটা যেন আরও গভীর। এই সকল অপরাধের সামনে কারা? আর পর্দার আড়ালে থাকা এর নেপথ্যের কারিগরইবা কারা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মাঠে নামে বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী দল।
লালমাই পাহাড়ে অপরাধের ছায়া
অনুসন্ধানের শুরুতেই সামনে আসে কুমিল্লার কোটবাড়ি-লালমাই পাহাড়। দিনের আলোয় পর্যটক আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য মুগ্ধতা ছড়ালেও সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই পাহাড়ে নেমে আসে যেন এক অশরীরী ছায়া।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যা নামতেই বদলে যায় এই এলাকার চিত্র। জনশূন্য পাহাড়ি পথগুলো তখন আর নিস্তব্ধ থাকে না—শুরু হয় সেখানে মানুষরূপী শয়তানদের আনাগোনা। মাদকসেবীদের আড্ডায় জমে ওঠে নির্জন এলাকা। তবে, নিরাপত্তার শঙ্কায় এসব নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতেও নারাজ স্থানীয়দের অনেকেই।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলতেই উঠে আসে অন্ধকারের আরও ভয়ংকর চিত্র—কিশোরদের দলবদ্ধ আড্ডা, মাদকসেবন আর নানা অপরাধের অভিযোগ। তবে, এসব বলতে গিয়েই থমকে যায় অনেকের কণ্ঠ। প্রতিবাদ তো দূরের কথা, চোখের সামনে কোনো অপরাধ দেখলেও মুখ খুলতে সাহস পায় না তারা।
স্থানীয়দের এমন আতঙ্কই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন তোলে—কিশোরদের এই দৌরাত্ম্যের আড়ালে রয়েছে কোনো রাঘববোয়ালের প্রশ্রয়? নাকি অন্ধকারের এই সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে আরও প্রভাবশালী কোনো হাত?
মাদক সরবরাহ, অর্থের জোগান, পরিবহন কিংবা অপরাধের পর পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ—এসবের নেপথ্যে কারা, সেটিও এখন সময়ের বড় প্রশ্ন। গোপন সূত্রে জানা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অনেক অপরাধী প্রতিবার পাড় পেয়ে যায়।
অন্যদিকে বিভিন্ন আইনজীবীর বক্তব্যেও পাওয়া যায়, কুমিল্লায় বাড়তে থাকা অপরাধজগতে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার ও প্রশ্ন
সম্প্রতি কোটবাড়ি-লালমাই পাহাড় এলাকায় ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইশায়েক শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা পাহাড়টি নিয়ে রহস্যের বেড়াজাল যেন আরও ঘনিভূত করেছে। সামনে আসছে এলাকার সার্বিক নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিও।
সেইসঙ্গে পাহাড়ের এই নির্জন-নিস্তব্ধ পরিবেশকে অপরাধীদের এক নীরব আস্তানা হিসেবে তুলে ধরা নানা অভিযোগের মধ্যে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার শানিত করেছে প্রশ্নের তীর। ১৩ বছরের কিশোর অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যুর সঙ্গে এই মাদকচক্রের আছে কি কোনো যোগসূত্র? উঠেছে এমন প্রশ্নও।
এদিকে রহস্যঘেরা জায়গায় ১৩ বছরের কিশোর অপ্রতিমের রহস্যময় মৃত্যু তৈরি করছে লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা ও অপরাধচক্রের নেটওয়ার্ক নিয়ে একের পর এক উদ্বেগজনক প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতেই কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে উপস্থিত হয় টিম বাংলা এডিশন।
পুলিশের অভিযান ও আশ্বাস
কথা হয় মিডিয়া সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ লুৎফর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, কুমিল্লায় মাদকের বিরুদ্ধে চলছে পুলিশের কঠোর অভিযান। রবিবার (১৬ আগস্ট)-এর পর এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৮০০ মাদকসেবী ও মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পাশাপাশি লালমাই পাহাড় ঘিরেও নিয়মিত অভিযান চলছে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। এমনকি কিশোর গ্যাংয়ের নেতাদের শনাক্ত করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সেইসঙ্গে অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সাম্প্রতিক প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, শিশুদের অপরাধে সম্পৃক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শিশু আইন ২০১৩ পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
কুমিল্লার পরিচয় শুধু খাদি, ময়নামতি কিংবা পাহাড়ঘেরা সৌন্দর্যে নয়। এই জনপদের প্রতিটি মানুষের নিরাপদ জীবনও তার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই পাহাড়ের আঁধার কাটিয়ে কবে ফিরবে দিনের আলো, আর অপরাধের নেপথ্যের কারিগররা কবে আসবে আইনের আওতায়—সেই অপেক্ষাতেই এখন কুমিল্লাবাসী।
আরও পড়ুন:







