চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সমুদ্র উপকূলজুড়ে প্রায় ৩৩ হাজার একর জমিতে ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন নিয়ে এক দশক আগে যাত্রা শুরু করে দেশের সর্ববৃহৎ জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। তবে এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাশিত গতি পায়নি শিল্পায়ন। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, দক্ষ শ্রমিকের অভাব, যোগাযোগ, আবাসন ও নিরাপত্তা সংকটে বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এক দশকে ১৭টি কারখানা উৎপাদনে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। আরও প্রায় ২৪টি কারখানা নির্মাণাধীন। ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা শিল্প স্থাপনে এগিয়ে এলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় অনেক প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলছে।
শিল্পাঞ্চলের অন্যতম প্রধান সমস্যা পানি। পর্যাপ্ত পানি সরবরাহব্যবস্থা না থাকায় কারখানাগুলোকে গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) এক কর্মকর্তা বলেন, ‘চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা আগামী বছরের শুরুতে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার আমরা বন্ধ করে দেব। ফেনী নদীর পানি প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহার শুরু করা হবে।’ প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তবে ফেনী নদীর পানি শিল্পাঞ্চলে ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে কৃষকদের স্বার্থ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদী থেকে পানি উত্তোলন বাড়লে কৃষিতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্যোক্তাদের মতে, উৎপাদন সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ জরুরি। মডার্ন টেক্সটাইলের জিএম সফল বড়ুয়া বলেন, ‘যেখানে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেখানে কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর থাকে। যেমন—নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসসহ অন্যান্য ইউটিলিটি নিশ্চিত হওয়া। এগুলো না থাকলে এ ধরনের প্রকল্প লাভজনকভাবে পরিচালনা করা খুবই কঠিন।’
প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কর্মরত থাকলেও দক্ষ শ্রমিকের সংকট রয়েছে। বাইরে থেকে শ্রমিক আনতে গিয়ে আবাসন ও যাতায়াত ব্যয় বাড়ছে। আশপাশের ইউনিয়ন ও গ্রামগুলোর সঙ্গে উন্নত সড়ক যোগাযোগ না থাকায় শ্রমিকদের আবাসন সমস্যাও বাড়ছে।
পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৫০০ একর জমি এখনো বুঝে না পাওয়ার অভিযোগ করেছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির অভিযোগ, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ড্রেনেজ সুবিধার ঘাটতিও রয়েছে।
বিকেএমইএর পরিচালক মোহাম্মদ সামছুল আজম বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত আমাদের প্লট ডিমারকেশন করে অ্যালটমেন্ট দেওয়া হচ্ছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত প্লট এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা না হবে, ততক্ষণ উদ্যোক্তারা কিসের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করবেন?’
বিজিএমইএর পরিচালক মোহাম্মদ সাইফ উল্যাহ মানসুর বলেন, ‘গার্মেন্টস শিল্পের জন্য ৫০০ একর জমি এখনো বেজা ডিমারকেশন করে দেয়নি। এখানে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থাও পুরোপুরি হয়নি। শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের সমুদ্র উপকূলের এ শিল্পাঞ্চলের আশপাশে শ্রমিকদের জন্য সরকারি-বেসরকারি আবাসন গড়ে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক মানের অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য যে পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন, সেগুলোরও ঘাটতি রয়েছে।’
নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বিনিয়োগকারীদের। সন্ধ্যার পর শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন অংশ অন্ধকার হয়ে পড়ে। নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠানের বাউন্ডারি ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় চুরির ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসকিউ ক্যাবলসের এইচআর এহসানুল কবির বলেন, ‘এটি মহাসড়ক থেকে প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটার ভেতরে এবং সমুদ্রের পাশে। রাতে অনেক এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। ভালো আলোকায়ন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা করতে হবে। অনুমোদনহীন ব্যক্তিদের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং শ্রমিকদেরও কাজের পরিবেশ সম্পর্কে আস্থা তৈরি হবে।’
অর্থনৈতিক অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ উপপরিদর্শক লুৎফর রহমান বলেন, ‘এত বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য আরও পর্যাপ্ত পুলিশ প্রয়োজন। আমাদের জনবল সীমিত। আমরা জোরারগঞ্জ থানার অধীনে অস্থায়ী ক্যাম্প হিসেবে কাজ করছি। কোনো অভিযোগ বা মামলা হলে থানায় যেতে হয়। শিল্পাঞ্চল থেকে থানার দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। এখানে শিল্প পুলিশের ক্যাম্পও রয়েছে, তারা তাদের মতো দায়িত্ব পালন করছে। এত বড় শিল্পাঞ্চলের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ থানা প্রয়োজন।’
এদিকে কচ্ছপিয়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সড়কের বিভিন্ন মোড়ে দিকনির্দেশনা না থাকায় অপরপ্রান্ত থেকে আসা গাড়ি বুঝতে সমস্যা হয়। স্থানীয়দের মতে, ওয়ানওয়ে সড়ক, গতিরোধক ও দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বদি উল্লাপাড়া সড়কের মুখে কোন শিল্পকারখানা কোন দিকে—এমন একটি মানচিত্র বা নির্দেশনাও প্রয়োজন।
মিরসরাই আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন এমপি বলেন, জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে মিরসরাই বাসির প্রত্যাশা অনেক। সে প্রত্যাশা পুরন করতে হলে শিল্প কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি স্থানীয়দের কর্মসংস্থান, দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা। আশপাশের গ্রামীন সড়কের উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করলে পরিকল্পিত মিরসরাই গড়ে উঠবে। শ্রমিকদের নিরাপদ আবাসন গড়ে উঠবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এখানে প্রায় ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যোগাযোগ, আবাসন, নিরাপত্তা ও দক্ষ মানবসম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন জরুরি। উদ্যোক্তাদের মতে, পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া শুধু প্লট বরাদ্দ দিয়ে এ বিশাল শিল্পাঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত গতি আনা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন:







