রবিবার

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২ আশ্বিন, ১৪৩৩

‘সবাই বাবাকে বাবা বইলা ডাকে, আমি পারি না’ লামিয়া

মোজাম্মেল হোসেন,ধামরাই প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:০৩

শেয়ার

‘সবাই বাবাকে বাবা বইলা ডাকে, আমি পারি না’ লামিয়া
ছবি: বাংলা এডিশন

‘সবাই বাবাকে বাবা বইলা ডাকে, আমি পারি না। আমারও অনেক কিছু খাইতে মন চায় কিন্তু মায়ের কাছে বায়না করি না। মা দিতে পারবে না-তাই বায়না করি না।’ কথাগুলো বলতে বলতে চোখের কোণে পানি জমে আসে ছোট্ট লামিয়ার। বাবাকে হারানোর শূন্যতা আর সংসারের অভাব যেন বয়সের আগেই তাকে অনেক কিছু বুঝতে শিখিয়েছে।

বাবা নেই। তাই মায়ের হাতই এখন লামিয়ার পুরো পৃথিবী। আর সেই মেয়েকে ঘিরেই নিজের সব কষ্ট ভুলে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন তার মা মৌসুমি। মাত্র তিন ফুট উচ্চতার এই শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী স্বামীকে হারানোর পর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে প্রতিদিন লড়াই করে যাচ্ছেন।

ঢাকার ধামরাই উপজেলার সূতিপাড়া ইউনিয়নের বালিথা গ্রামের মৌসুমির বয়স ৩২ বছর। ছোটবেলা থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে উঠেছেন তিনি। সুখের আশায় সাত বছর আগে পাশের গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের গান্ধুলিয়া গ্রামে বিয়ে হয় তার। স্বামী-সন্তান নিয়ে ছোট্ট সংসারে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যু হলে মুহূর্তেই বদলে যায় মৌসুমির জীবন। একদিকে স্বামী হারানোর শোক, অন্যদিকে ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই একা সন্তানকে বড় করার কঠিন দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে।

স্বামী মারা যাওয়ার পর মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই হয়নি মৌসুমির। অবশেষে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু সেখানেও অভাবের সংসারে সবার সঙ্গে জায়গা ভাগ করে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে মেয়েকে নিয়ে আলাদা ঘরে শুরু হয় মা-মেয়ের নতুন জীবনসংগ্রাম।

সংসার চালাতে একটি স্কুলে অফিস সহায়কের কাজ করেন মৌসুমি। মাসে পান মাত্র দুই হাজার টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই খাবার, মেয়ের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন তিনি। কখনো অন্যের বাড়িতেও কাজ করেন। নিজের প্রয়োজনকে দূরে সরিয়ে মেয়ের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই যেন তার একমাত্র চিন্তা।

মৌসুমির নিজের জন্য হয়তো ভালো খাবার কেনার সামর্থ্য নেই, নেই নতুন পোশাকের আবদার করার সুযোগ। কিন্তু মেয়ের খাতা-কলম কিংবা পড়াশোনার খরচ যেন বন্ধ না হয়, সেই চেষ্টা থেকে পিছিয়ে যেতে চান না তিনি।

কথা বলতে বলতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মৌসুমি বলেন, “আমার নিজের জীবনের জন্য আর কোনো চাওয়া নেই। শুধু চাই, আমার মেয়েটাকে পড়াশোনা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে। ওর বাবা নেই, ওকে নিয়ে আমার অনেক ভয় হয়। ওর কোনো আবদার পূরণ করতে না পারলে বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে।”

তিনি বলেন, “আমি চাই আমার মেয়ে একদিন ডাক্তার হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তখন হয়তো আমার এই কষ্টগুলো আর থাকবে না। আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, মেয়েটাকে নিয়ে মাথা গোঁজার মতো নিজের একটা ঘর নেই। সরকার যদি আমাদের একটা স্থায়ী ঘরের ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে অন্তত মেয়েটাকে নিয়ে একটু নিশ্চিন্তে থাকতে পারব।”

মায়ের কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখছে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছোট্ট লামিয়া। বাবাকে হারানোর শূন্যতা যেমন তাকে কাঁদায়, তেমনি মায়ের অসহায়ত্বও তাকে বুঝতে শেখাচ্ছে বাস্তবতার কঠিন হিসাব।

লামিয়ার স্বপ্ন, একদিন সে ডাক্তার হবে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মায়ের সব কষ্ট দূর করবে। তাই ছোট ছোট অনেক ইচ্ছা থাকলেও মায়ের কাছে বায়না ধরে না সে।

“সবাই বাবাকে বাবা বলে ডাকে, আমি পারি না। আমারও অনেক কিছু খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মায়ের কাছে বায়না ধরতে পারি না। মা দিতে পারবে না। তাই চুপ করে থাকি,”—বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে লামিয়ার।

মা-মেয়ের এই অসহায় জীবনের কথা জানার পর পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় সেবামূলক সংগঠন ‘আস্থার আলো যুব ফাউন্ডেশন’। সংগঠনটির পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংগঠনটির সভাপতি শরিফুল ইসলাম বলেন, “আমাদের মতো আরও সংগঠন ও সমাজের সবাই যদি লামিয়ার পাশে দাঁড়ায়, তাহলে হয়তো এই মা-মেয়ের কষ্ট কিছুটা কমবে। লামিয়ার পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং তার ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে না।”

স্থানীয়দেরও প্রত্যাশা, শুধু সহানুভূতি নয় মৌসুমির মতো অসহায় পরিবারের জন্য প্রয়োজন বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা। একটি স্থায়ী ঘর, মেয়ের পড়াশোনার নিশ্চয়তা এবং নিয়মিত সহায়তা পেলে হয়তো মা-মেয়ের জীবনটা কিছুটা সহজ হবে।

এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল মামুন বলেন, “স্বামীহারা শারীরিক প্রতিবন্ধী মৌসুমি মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকছেন আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। মৌসুমি ও তাঁর মেয়ের পাশে আমরা থাকতে চাই। বিশেষ করে মেয়ের পড়াশোনা যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।”

স্বামী নেই, শরীরেও নেই পূর্ণ শক্তি। নেই নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ, নেই নিজের একটি স্থায়ী ঘর। তবুও মেয়ের স্বপ্নের কাছে হার মানতে নারাজ মৌসুমি। নিজের জীবনের সব কষ্ট ভুলে তিনি শুধু চান, তার মেয়ে একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াক।

বাবাহারা লামিয়ার চোখে তাই এখনও বড় স্বপ্ন একদিন সে ডাক্তার হবে। আর মায়ের সব কষ্ট দূর করবে।

মায়ের হাত শক্ত করে ধরে সেই স্বপ্নের পথেই হাঁটছে ছোট্ট লামিয়া। পথটা যতই কঠিন হোক, মেয়ের ভবিষ্যতের কাছে হার মানতে রাজি নন তিন ফুট উচ্চতার এই মা।