শনিবার

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১ আশ্বিন, ১৪৩৩

ইলিশের মৌসুমেও নদীতে মাছ কম, ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় জেলেরা

মো.জাহিদ,ঝালকাঠি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:১৫

শেয়ার

ইলিশের মৌসুমেও নদীতে মাছ কম, ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় জেলেরা
ছবি: বাংলা এডিশন

ঝালকাঠির সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাচ্ছেন না জেলেরা। দিনভর নদীতে ঘুরে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে অনেক সময় নৌকার জ্বালানি, বরফ, খাবার ও জালের খরচই উঠছে না।

এর মধ্যে রয়েছে এনজিওর ঋণের কিস্তি ও মহাজনের দাদন পরিশোধের চাপ। সামনে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে জেলেদের।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার পোনাবালিয়া, দেউরি, বাদুরতলা ও চল্লিশকাউনিয়া এবং নলছিটি উপজেলার মাটিভাঙ্গা এলাকার জেলেদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

জেলেরা জানান, ইলিশের মৌসুমকে সামনে রেখে নৌকা ও জাল মেরামত, নতুন জাল কেনা এবং মাছ ধরার অন্যান্য খরচ মেটাতে অনেকে এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। মৌসুমে ভালো মাছ পাওয়া গেলে বিক্রির আয় থেকে ঋণ ও দাদন পরিশোধের পাশাপাশি পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু চলতি মৌসুমে আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে।

দেউরি গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী জেলে নুরু মিয়া জীবনের প্রায় পুরোটা সময় সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে মাছ ধরে কাটিয়েছেন। নদীর গতিপ্রকৃতি ও মাছ ধরার স্থান সম্পর্কে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও এবার আগের মতো ইলিশ পাচ্ছেন না তিনি।

নুরু মিয়া বলেন, অনেক দিন মাছ বিক্রি করে নৌকার তেলের খরচও ওঠে না। সামনে নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে। তখন মাছ ধরতে পারব না। সংসার কীভাবে চলবে, ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব এই চিন্তাই এখন মাথায় ঘুরছে।

বাদুরতলার জেলে কাদের মাঝিও একই ধরনের সমস্যার কথা জানান। তিনি বলেন, সারাদিন নদীতে থাকার পর যে মাছ পাওয়া যায়, তাতে নৌকার তেল ও জালের খরচ মেটানোই কঠিন। এর মধ্যে নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে।

জেলেরা জানান, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ আহরণের সময়কে তাঁরা বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম হিসেবে দেখেন। এই কয়েক মাসের আয়ের ওপর নির্ভর করে অনেক পরিবার সারা বছরের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ চালায়। কিন্তু চলতি মৌসুমে ইলিশের পরিমাণ কম থাকায় তাঁদের আয়ও কমে গেছে। ফলে সংসারের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় ইলিশ আহরণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছায়নি। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, দেশের অন্যান্য জেলার নদ-নদীতে তুলনামূলক বেশি ইলিশ ধরা পড়লেও সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে ইলিশের উপস্থিতি কম। পানিদূষণ ও নদীতে পলি জমার কারণে এমনটি হতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।

নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে জেলেদের মাছ ধরার আয় বন্ধ থাকবে। তবে ঋণের কিস্তি ও মহাজনের দাদন পরিশোধের চাপ থেকে যাবে। ফলে নিষেধাজ্ঞার আগে নদীতে ইলিশের বড় ঝাঁক পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন তাঁরা।

জেলেদের কাছে ইলিশ আহরণ কেবল মাছ ধরার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের পরিবারের খাদ্য, সন্তানদের পড়াশোনা, ঋণ পরিশোধ এবং জীবিকার নিরাপত্তা। নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় সেই জীবিকা এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।