সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার গুপিরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খুরশিদ জিন্নাহর বিরুদ্ধে সহকর্মী নারী শিক্ষকদের প্রতি অশালীন আচরণ, কুপ্রস্তাব প্রদান ও মানসিক হেনস্তাসহ গুরুতর নানা অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী পাঁচজন সহকারী শিক্ষিকা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর দায়ের করা ওই লিখিত অভিযোগে প্রধান শিক্ষক খুরশিদ জিন্নাহর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন, কুরুচিপূর্ণ আচরণ এবং নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অমানবিক ব্যবহারের বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে নারী সহকর্মীদের সঙ্গে আপত্তিকর ভাষায় কথা বলা ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছেন। তার অন্যায্য প্রস্তাবে রাজি না হলে বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে শিক্ষকদের শোকজ, বদলি এবং চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের প্রতিও তিনি অশোভন আচরণ করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগেও জামুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক থাকাকালে একই ধরনের অভিযোগে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু গুপিরপাড়া বিদ্যালয়ে যোগদানের পর তিনি পুনরায় পুরোনো অসদাচরণ শুরু করেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভুক্তভোগী সহকারী শিক্ষিকা শামীমা জাহান জানান, গত ৪ আগস্ট প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষের বাইরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে বমি করতে থাকে। পরিস্থিতি দেখেও প্রধান শিক্ষক তার কার্যালয় থেকে বের হননি। পরে তিনি নিজেই শিশুটিকে উদ্ধার করে ক্লাসরুমে এনে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। তিনি শিশুটিকে নিয়ে ক্লাসরুমে ঢোকার মুখে প্রধান শিক্ষক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তাকে ‘বেয়াদব’ বলে গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে তিনি গায়ে হাত তোলার জন্য তেড়ে আসেন। এ সময় অন্য নারী শিক্ষকরা এগিয়ে এসে প্রতিবাদ জানালে তাদের সঙ্গেও চরম দুর্ব্যবহার করা হয়। শিক্ষিকা শামীমা জাহান আরও জানান, গত ২০ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্ত সম্পন্ন হলেও প্রভাব খাটানোর কারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া নিয়ে তারা শঙ্কায় রয়েছেন।
অন্য সহকারী শিক্ষিকা আমিনা খাতুন সনি, ফারজানা ইয়াসমিন, মর্জিনা খাতুন ও সুরাইয়া পারভীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খুরশিদ জিন্নাহর আচরণ কোনোভাবেই একজন আদর্শ শিক্ষকের সঙ্গে মেলে না। গত ১১ বছর ধরে তারা এই প্রধান শিক্ষকের অব্যাহত দুর্ব্যবহার ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করছেন। প্রধান শিক্ষক প্রকাশ্যে দম্ভোক্তি করে বলেন—ডিপিও, টিও ও এটিও নাকি তার ‘পকেটে থাকে’। বিদ্যালয়ে প্রতিটি কর্মদিবস শুরু হয় তার চিৎকার-চেঁচামেচি দিয়ে। সুযোগ পেলেই তিনি নারী শিক্ষকদের গায়ে হাত দেওয়ার অপচেষ্টা চালান এবং তাদের চরিত্র নিয়ে সমাজে কুৎসা রটান। তার অনৈতিক দাবিতে সায় না দেয়ায় প্রতিনিয়ত তাদের দাপ্তরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে প্রধান শিক্ষক খুরশিদ জিন্নাহ সাংবাদিকদের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আপেল মাহমুদ জানান, অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্তভাবে লেখার কাজ চলছে; প্রতিবেদন প্রস্তুত হলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তা দাখিল করা হবে।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাহার উদ্দিন সহকারী শিক্ষিকাদের লিখিত অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিধিমোতাবেক প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আরও পড়ুন:







