বগুড়া মাসের পর মাস সরকারি দায়িত্ব পালন করেও ভ্রমণ ভাতা (টিএ) পাচ্ছিলেন না বগুড়া জেলা পুলিশের অনেক সদস্য। অথচ এ খাতে বরাদ্দ আসছিল নিয়মিত, দ্রুতই শেষও হয়ে যাচ্ছিল সেই অর্থ। এ নিয়ে পুলিশের ভেতরে ছিল অসন্তোষ ও সন্দেহ। শেষ পর্যন্ত পুলিশ সুপারের কম্পিউটার আইডি অন্য কেউ ব্যবহার করার ঘটনা ধরা পড়ার পর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে টিএ বিল জালিয়াতির তথ্য।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভুয়া টিএ বিল তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ এরই মধ্যে তিন কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ঘটনায় বগুড়া জেলা পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মরত প্রায় ৩০ সদস্যের নাম তদন্তে এসেছে। তাঁদের মধ্যে ২০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্ত এগোলে জড়িত সদস্য ও আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তদন্তে বগুড়া জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অডিটর ফিরোজ আলম ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলামের নাম এসেছে। ঘটনার পর ফিরোজ আলমকে রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
বগুড়ার পুলিশ সুপার মীর্জা সায়েম মাহমুদের ভাষ্য, গত ১৯ আগস্ট সকালে দাপ্তরিক কাজ করার সময় তিনি দেখতে পান তাঁর কম্পিউটার আইডিতে অস্বাভাবিকতা রয়েছে। ধারণা হয়, অন্য কেউ তাঁর আইডি ব্যবহার করেছে। বিষয়টি তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাকে জানান। ওই দিন বিকেলে আইডির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর শুরু হয় অনুসন্ধান। তখন দেখা যায়, পুলিশ সুপারের আইডি ব্যবহার করে বিভিন্ন পুলিশ সদস্যের নামে টিএ বিল তৈরি করে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তখনই পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলাম ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অডিটর ফিরোজ আলমের নাম সামনে আসে। পরে জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত আরও ছয় সদস্যের ব্যাংক হিসাব যাচাই করে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এরপরই তদন্তের পরিধি বাড়তে থাকে।
ঘটনার পর গত ২৬ আগস্ট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আসাদুজ্জামানকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা পুলিশ। কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। তদন্ত কমিটির একজন সদস্য বলেন, গত ১ সেপ্টেম্বর কাজ শুরু করার পর একের পর এক পুলিশ সদস্যের নাম সামনে আসতে থাকে। তাঁদের কেউ বগুড়ায় কর্মরত, আবার কেউ বর্তমানে অন্য জেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। তদন্ত কমিটির চিঠির পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজন পুলিশ সদস্য দাবি করেন, তাঁদের ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হলেও পরে সেই অর্থ তুলে ফিরোজ আলম ও রাজিবুল ইসলামের হাতে দিতে হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, পুলিশ সদস্যদের এসব বক্তব্য যাচাই করতে ব্যাংক লেনদেন, টিএ বিল, রেজিস্টার ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের নথি মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত ফিরোজ আলম ও রাজিবুল ইসলামের ব্যাংক হিসাবে এসব টাকা জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ‘টাকা তুলে ফিরোজকে দিয়েছি’ জিজ্ঞাসাবাদ করা এক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অডিটর ফিরোজ আলমের সঙ্গে তাঁর আগে থেকেই পরিচয় ছিল। একপর্যায়ে ফিরোজ তাঁকে জানান, তাঁর শ্বশুর জমি বিক্রি করে মেয়েকে বাড়ি করার জন্য কিছু টাকা পাঠাবেন। কিন্তু স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে জটিলতা থাকায় টাকা পাঠানো যাচ্ছে না। ওই পুলিশ সদস্যের দাবি, তাঁর ব্যাংক হিসাবে টাকা এলে তিনি তা তুলে ফিরোজ আলমকে দিয়েছেন। বিনিময়ে ফিরোজ তাঁকে সামান্য কিছু টাকা দেন, যা দিয়ে তিনি বাসার জন্য ফল কিনেছিলেন।ওই পুলিশ সদস্য বলেন, তদন্ত কমিটির কাছেও তিনি একই বক্তব্য দিয়েছেন। তবে তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কার হিসাবে কত টাকা জমা হয়েছে, কার মাধ্যমে সেই অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থ কোথায় গেছে,এসব বিষয় এখন যাচাই করা হচ্ছে। দুই হাজারের বেশি পুলিশের টিএ বিল যাচাইঃ জালিয়াতির পরিধি জানতে বগুড়া জেলা পুলিশের দুই হাজারের বেশি সদস্যের টিএ বিল রেজিস্টার যাচাই করা হচ্ছে। পুরোনো বিল, বরাদ্দ, হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে পাঠানো কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক লেনদেন মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মীর্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ সদস্যরা টিএ বিল পাচ্ছিলেন না। অথচ বরাদ্দ আসার পর তা শেষ হয়ে যাচ্ছিল। বিষয়টি তাঁর কাছেও সন্দেহজনক মনে হয়েছিল। পরে আইডি হ্যাক করে ব্যবহারের ঘটনা ধরা পড়ার পর বিষয়টি তদন্তে আসে। তিনি বলেন, জেলা পুলিশের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ সুপার আরও বলেন, বগুড়ার ঘটনাটি পুলিশ সদর দপ্তরে জানানোর পর অন্যান্য জেলায়ও এ ধরনের জালিয়াতি হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
বগুড়া জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আছাদুজ্জামান সরকার বলেন, জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর অডিটর ফিরোজ আলমকে রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধান কার্যালয় থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার মামুন উল মান্নানের নেতৃত্বে ওই কমিটি বগুড়ায় এসে তদন্ত করে গেছে। তবে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে এখনো কিছু জানা যায়নি। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কয়েকটি ভুয়া বিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আরও বেশি সংখ্যক পুলিশ সদস্য এবং বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আত্মসাৎ করা অর্থ কীভাবে উদ্ধার করা যায়, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত জড়িত ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা ও আত্মসাৎ করা অর্থের চূড়ান্ত পরিমাণ নিশ্চিত নয়। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩ কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থের হিসাব মিলছে না এবং প্রায় ৩০ পুলিশ সদস্যের নাম তদন্তে এসেছে।
আরও পড়ুন:







