শুক্রবার

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০ আশ্বিন, ১৪৩৩

দালালের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত পরিবার, মালয়েশিয়া থেকে ফিরল রফিকের নিথর দেহ

আবু জাহের, শেরপুর (বগুড়া)

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:৫১

শেয়ার

দালালের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত পরিবার, মালয়েশিয়া থেকে ফিরল রফিকের নিথর দেহ
ছবি: সংগৃহীত

সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় শেষ সম্বল ভিটেমাটি বিক্রি করেছিলেন রফিকুল ইসলাম (৪৫)। সঙ্গে ছিল চড়া সুদের ঋণ। ভালো চাকরি করে পরিবারের অভাব ঘোচাবেন—এমন স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে সেই স্বপ্ন পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। পরিবারের অভিযোগ, দালালের প্রতারণার শিকার হয়ে চাকরির বদলে ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে নানা সংকটে পড়েন রফিকুল। পরে তার কাছ থেকে আরও টাকা নেয়া হয়। একপর্যায়ে পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ পরিবারের।

শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে মালয়েশিয়ায় মারা যান রফিকুল। শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে তার মরদেহ বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি ইউনিয়নের ফারাজীপাড়া গ্রামে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। স্বামীকে হারিয়ে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন স্ত্রী স্বপ্না খাতুন।

রফিকুল ইসলাম ওই গ্রামের মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে।

নিহতের ছেলে শাহরিয়ার নাফিস, পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দারিদ্র্যের কারণে সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রফিকুল। এ সময় একই গ্রামের নাসিমা খাতুন, তার স্বামী সাইফুল ইসলাম, মেয়ে সোনিয়া আক্তার ও মেয়ের জামাই মুসা তাকে মালয়েশিয়ায় ভালো চাকরি দেয়ার আশ্বাস দেন বলে পরিবারের দাবি।

পরিবারের অভিযোগ, তাদের কথায় বিশ্বাস করে জমি বিক্রি ও ঋণ করে রফিকুল বিদেশে যাওয়ার টাকা জোগাড় করেন। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, চাকরির ওয়ার্ক পারমিট বা আকামার পরিবর্তে তাকে তিন মাসের ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়েছে।

ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সেখানে অবৈধ অবস্থায় পড়েন রফিকুল। পুলিশের ভয়ে দিনের পর দিন আত্মগোপনে থাকতে হয় তাকে। এ সময় চাকরি দেয়ার আশ্বাসে অভিযুক্ত নাসিমা খাতুন ও তার জামাই মুসা পরিবারের কাছ থেকে আরও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নেন বলে অভিযোগ স্বজনদের।

তবে টাকা নেওয়ার পরও রফিকুলকে চাকরি দেওয়া হয়নি বলে পরিবারের দাবি। বরং তার পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই পরিস্থিতিতে অসুস্থ হয়ে একপর্যায়ে মালয়েশিয়ায় তার মৃত্যু হয়।

পরে পরিবারের চেষ্টায় রফিকুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। শুক্রবার সকালে মরদেহ গ্রামে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। এদিকে অভিযুক্ত দালাল পরিবারের বাড়িতে তালা ঝুলতে দেখা যায়।

স্বামীকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে রফিকুলের স্ত্রী স্বপ্না খাতুন বলেন, “আমগোর শেষ সম্বল জমিটুকু বেইচা আর ঋণ কইরা টাকা দিছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমার জামাইটারে দালালরা মিছা কথা বইলা নিয়া মাইরা ফেললো। এখন আমি এই দুইডা এতিম ছাওয়াল-মিয়া নিয়া কোনহানে দাঁড়ামু?”

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্তদের বাড়িতে গেলে তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

শেরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এস এম মঈনুদ্দীন বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।