কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের সারন্দা এলাকা। দিনের আলোতেও জায়গাটিতে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা। চারপাশে কেবল পাহাড় আর গাছপালার রাজত্ব, নেই মানুষের আনাগোনা, নেই চিরচেনা কোলাহল। আর রাত নামলে এই নির্জনতাই রূপ নেয় এক ভয়ংকর অন্ধকারে।
সম্প্রতি এই নিস্তব্ধ লালমাই পাহাড় থেকেই উদ্ধার হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়েক শাহরিয়ার অপ্রতিমের নিথর দেহ। অপ্রতিম কীভাবে এই গহন পাহাড়ে গেল? কারা তাকে নিয়ে এল? হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই চারদিকে ঘুরছে এমন প্রশ্ন।
সেই রহস্যের জাল খুলতেই বাংলা এডিশন সারন্দায় ঘটনাস্থলে। পাহাড়ের ভেতরে যতই এগোনো, পরিবেশও যেন ততই বদলে গেছে।
সারন্দায় মাদকের আড্ডা ও স্থানীয়দের আতঙ্ক
পাহাড়ের এই নির্জন অংশে নাকি প্রকাশ্যে বসে মাদকের আড্ডা। স্থানীয়দের দাবি, সন্ধ্যা নামলেই বিভিন্ন বয়সী মানুষের আনাগোনায় মুখর হয়ে ওঠে এই জনশূন্য এলাকা। চলে বেপরোয়া মাদক সেবন। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে প্রকাশ্যে এসব নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ বেশিরভাগ মানুষ।
দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করা মানুষগুলো আতঙ্কে থাকে সবসময়। রাত হলে প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হয় না। প্রতিবাদ তো দূরের কথা, কোনো অপরাধ দেখে ফেললে উল্টো নিজেদের প্রাণনাশের শঙ্কায় ভোগে স্থানীয়রা।
তবে কি অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের এই নির্জন এলাকাটি আগে থেকেই অপরাধীদের কোনো নিরাপদ আস্তানা ছিল? ১৩ বছরের কিশোর অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যুর সঙ্গে এই মাদকচক্রের কোনো যোগসূত্র নেই তো? উঠেছে এমনসব প্রশ্ন।
নিখোঁজ থেকে খোঁজাখুঁজি
এ নিয়ে অপ্রতিমের বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, প্রতিদিনের জানা রুটিন ভেঙে হঠাৎই নিখোঁজ তরুণ অপ্রতিম। সাধারণত দুপুর দুইটা থেকে তিনটার মধ্যে বাসা থেকে বের হয়ে সন্ধ্যা সাতটা থেকে আটটার মধ্যে ঘরে ফেরাই ছিল অপ্রতিমের নিয়ম। তবে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার পর থেকে রহস্যজনকভাবে বন্ধ পাওয়া যায় তার মোবাইল ফোন।
তিনি আরও বলেন, ছেলেকে ফোনে না পেয়ে চিন্তিত স্বজনরা যোগাযোগ করেন তাদের দোকানের এক কর্মচারী ফাহাদের সঙ্গে। ফাহাদ জানায়, তুহিন নামের এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে ছবি তুলতে গেছেন অপ্রতিম। পরবর্তীতে অপ্রতিমের বাবার পরামর্শে বন্ধুমহলের গ্রুপে নিখোঁজের বার্তা জানিয়ে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি।
একপর্যায়ে র্যাবের প্রযুক্তিগত সহায়তায় সামাজিক বনায়ন এলাকায় শনাক্ত হয় অপ্রতিমের সর্বশেষ অবস্থান। সেখানে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা মেলে সাদা শার্ট পরা এক যুবকের। রহস্যের জট খুলতে পরবর্তীতে সেই সিসিটিভি ফুটেজ দেখানো হয় বন্ধু ফাহাদকে। ফুটেজ দেখে ফাহাদ নিশ্চিত করে, সাদা শার্ট পরা ওই ছেলেই তার উল্লেখিত সেই তুহিন।
জেলাজুড়ে অভিযান ও দাউদকান্দিতে হামলা
অপ্রতিমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুমিল্লার ১৮টি থানায় কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাতের এই বিশেষ অভিযানে জেলাজুড়ে ৬২৪ জন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। তবে এই কড়া অভিযানের মধ্যেই দাউদকান্দি থানায় নজিরবিহীন হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে আসামিদের ছিনিয়ে নিয়েছে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
থানায় হামলা ও আসামি ছিনতাইয়ের মতো দুঃসাহসিক এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে পুরো এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি মো. রকিবুল ইসলাম জানান, কুমিল্লা জেলাজুড়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ৬২৪ জনকে আইনের আওতায় এনেছে পুলিশ। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
রহস্য ঘিরে নতুন প্রশ্ন
১৩ বছরের কিশোর অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি পরিবারকেই নিঃস্ব করেনি, বরং উসকে দিয়েছে লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা ও অপরাধচক্রের নেটওয়ার্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন। আর থানা ভাঙচুর কিংবা আসামি ছিনতাইয়ের উত্তেজনা উসকে দিয়েছে ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিয়ে। সবমিলিয়ে অপ্রতিমের মৃত্যুর জায়গা, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতের আলোচনা আর স্থানীয়দের থানা ভাঙচুর ঘটনার ভেতরে আরেক ঘটনার সন্দেহ আরও ঘনীভূত করেছে। যে রহস্য উন্মোচন করাই হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় সফলতা।
আরও পড়ুন:







