দুই বছর আগে বগুড়া থেকে প্রত্যাহার হওয়া বিচারক মনিরুজ্জামান পুনরায় জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে যোগ দেয়ার পর তাঁর আদালত বর্জনকে কেন্দ্র করে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আদালতকক্ষে পুলিশ প্রবেশ করলে বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান।
বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এজলাসে এ ঘটনা ঘটে।
আদালত সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তৎকালীন বগুড়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুজ্জামান ও জেলা ও দায়রা জজ মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন আদালতের কর্মচারী ও আইনজীবীদের একাংশ। পরে দুজনকেই বগুড়া থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এর মধ্যে মোজাম্মেল হককে পরবর্তীতে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
সম্প্রতি মনিরুজ্জামান জেলা ও দায়রা জজ পদে পদোন্নতি পেয়ে বগুড়ায় বদলির আদেশ পান। বুধবার তিনি বগুড়ায় যোগ দিয়ে দুপুরে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এজলাসে বসেন।
এ সময় বগুড়া অ্যাডভোকেটস বার সমিতির নেতারা তাঁর আদালত বর্জনের ঘোষণা দিয়ে মামলার শুনানিতে বাধা দেন। তবে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের অপর একটি অংশ আদালতের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাঁরা পরস্পরকে ধাক্কাধাক্কি ও হট্টগোলে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান। পরে আদালত পুলিশ গিয়ে দুই পক্ষের আইনজীবীদের সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
বগুড়া অ্যাডভোকেটস বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, মনিরুজ্জামান বগুড়ায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালে আওয়ামী লীগ সরকারের আজ্ঞাবহ বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির নেতা-কর্মীদের জামিন না দিয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখার অভিযোগে ৫ আগস্টের পর তাঁর বিরুদ্ধে আইনজীবী ও আদালত কর্মচারীরা আন্দোলন করেছিলেন।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বগুড়া থেকে প্রত্যাহার হওয়ার পর তিনি আবার জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে বগুড়ায় বদলির আদেশ পেয়েছেন। এ খবর পাওয়ার পর আমরা সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর বদলির আদেশ বাতিলের দাবি জানিয়েছিলাম। একই সঙ্গে তিনি বগুড়ায় যোগ দিলে আদালত বর্জনের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বুধবার তিনি এজলাসে বসে মামলার শুনানি শুরু করলে আমরা সেখানে বাধা দিতে যাই। এ সময় জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য ও শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহাবের নেতৃত্বে কয়েকজন জুনিয়র আইনজীবী আমাদের সঙ্গে হট্টগোলে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে বার সমিতির সভাপতি রেজাউর রহমানকে ধাক্কা দিয়ে এজলাস থেকে বের করে দেয়া হয়।’
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আব্দুল ওয়াহাব। তিনি বলেন, আদালত বর্জনের কর্মসূচির সঙ্গে তাঁরাও একমত ছিলেন। বিচারক যোগদানের পর বার সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাঁর খাসকামরায় গিয়ে কর্মসূচির বিষয়টি জানান। পরে বিচারক এজলাসে বসেন।
আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘একটি মামলার শুনানি শেষে বার সমিতির নেতারা আবার এসে বাধা দেন। আদালত বর্জনের কর্মসূচি থাকলে তাঁরা বিচারকের খাসকামরায় গেলেন কেন? তাঁরা বের হওয়ার পর বিচারক এজলাসে বসলে আমরা জুনিয়র আইনজীবীরা মামলার শুনানি শুরু করি। এরপর বার সমিতির নেতারা বাধা দিতে এলে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।’
বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম অবশ্য বলেন, বিচারকের খাসকামরায় তাঁরা আদালত বর্জনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানাতেই গিয়েছিলেন। বিচারক নিয়ম রক্ষার জন্য একটি মামলার শুনানি করে কার্যক্রম স্থগিত রাখবেন বলে তাঁদের জানান। তাঁর সম্মানে একটি মামলার শুনানি করতে দেওয়া হলেও পরে আব্দুল ওয়াহাব একটি হত্যা মামলায় আসামির জামিন করান এবং আরও মামলার শুনানি শুরু করেন।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ১৯৮৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল করেছি। বগুড়া জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সহসভাপতিও ছিলাম। এখনো সংগঠনটির উপদেষ্টা। অথচ আব্দুল ওয়াহাবের নেতৃত্বে কয়েকজন জুনিয়র আইনজীবী বার সমিতির সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এজলাসে হট্টগোল করেছেন এবং সভাপতিকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছেন।’
বগুড়া আদালত পুলিশের পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম বলেন, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এজলাসকক্ষে আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল শুরু হলে পুলিশ গিয়ে তাঁদের সরিয়ে দেয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
আরও পড়ুন:







